আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) যে পরিমাণ ব্যক্তি গ্রেপ্তার হচ্ছেন, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই বৈধ জবাবদিহির চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বেশি চোখে পড়ছে। তার মধ্যে একটি ঘটনা অনেক বেশি প্রকাশ্য রাজনৈতিক বলে মনে হয়। সেটি হলো, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত তিন সাংবাদিক শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপা ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ও মন্তব্য করায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার রয়েছেন।
এই অভিযোগে তাদের আসামি করার বিষয়ে জানতে চাইলে গত ৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, তাদের বিরুদ্ধে ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ রয়েছে। এর আগে, ১৭ আগস্ট তামীম এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করার নামে কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। যে বক্তব্যের প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের রাজাকার, রাজাকারের বাচ্চা বলেছিলেন, রাজাকারের নাতি-পুতি বলেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলন করা বা সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করাই হলো সাংবাদিকদের দায়িত্ব। কিন্তু আমরা ওই পিরিয়ডে দেখেছি যে কিছু নির্দিষ্ট সাংবাদিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হতেন এবং তারা যে বক্তব্যগুলো দিতেন, সেগুলো আসলে কোনো প্রশ্ন ছিল না, সেগুলো ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা এবং তাকে দিয়ে কিছু কথা বলানোর জন্য কিছু উসকানিমূলক প্রস্তাব। যে কারণেই এই অফেন্সগুলো কমিটেড হয়েছে।’
প্রসিকিউশনের লিখিত ‘প্রাথমিক অভিযোগে’ আরও কিছুটা বিস্তারিত উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের ‘উসকানি’র কারণেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাতজনের মৃত্যু হয়েছিল।
প্রসিকিউটররা কেন এমন ভুল করছেন, সেই ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে এটি স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শত শত আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিল। এসব হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারীদের বিরুদ্ধে জোরালো প্রমাণের ভিত্তিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে যথাযথ মামলা হতে পারে।
কিন্তু ১৪ জুলাইয়ের ওই সংবাদ সম্মেলনে যা ঘটেছিল, এই সাংবাদিকরা যা বলেছিলেন, তার কিছুই এমন অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তারের বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি তৈরি করে না। তারপরও এমন কিছু করার অর্থ হলো, আইনের ভুল প্রয়োগ ও ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার অপব্যবহার।
আইসিটির প্রসিকিউটররা যা করছেন তা থেকে এই ধারণায় পৌঁছাতে হচ্ছে যে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সাংবাদিকদের যেকোনো কাজ বা বক্তব্যকে মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে—তা অপরাধমূলক আচরণের পর্যায়ে পড়ুক বা না পড়ুক। এর মাধ্যমে প্রসিকিউটররা স্পষ্টতই নির্ধারিত পরিসরের বাইরে গিয়ে আইনের প্রয়োগ করছেন।
এই সাংবাদিকরা সেদিন কী বলেছিলেন?
ভোরের কাগজের তৎকালীন সম্পাদক শ্যামল দত্ত ওই সংবাদ সম্মেলনে কোনো প্রশ্নই করেননি। তারপরও প্রসিকিউটররা তাকে কেন আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, সেটা এক রহস্য।
একাত্তর টিভির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু তিনটি মন্তব্য করেছিলেন। সেগুলোকে আসলে প্রশ্ন বলা যায় না। এর মধ্যে শুধু প্রথমটি আন্দোলন নিয়ে ছিল। বাকি দুটি ছিল গণমাধ্যমে হাসিনার চীন সফরের সময় সম্পাদিত চুক্তিগুলো নিয়ে কাভারেজ ও শিক্ষকদের পেনশন আন্দোলন নিয়ে।
তিনি বলেছিলেন, আন্দোলনকারীরা ‘সংবিধানবিরোধী’ এবং ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে (মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা করছে, অথবা) তাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করছে’, আর ‘তারা আমাদের কোমলমতি তরুণদের আদালতবিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, সংবিধানবিরোধী করে তুলছে।’ তবে তিনি শেষে বলেন, ‘এই (তরুণরা) আসলে ভুক্তভোগী। আমরা তাদের ওপর রাগ করতে পারি না। তারা অপবুদ্ধিজীবীদের অপকৌশলের শিকার। আমাদের তাদের মুক্ত করতে হবে।’
কেউ এই মতের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার না-ও হতে পারেন। কিন্তু, তারপরও এটি একটি গ্রহণযোগ্য মতামত এবং একটি মন্তব্যে তো আন্দোলনরত তরুণদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
একাত্তর টিভির সাংবাদিক ফারজানা রূপা একটি প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়া ১৯৭১ সালের এক মুক্তিযোদ্ধার দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘তার স্ত্রী ক্যানসার আক্রান্ত, তার নিজের স্বাস্থ্যও খুব খারাপ। কিন্তু চিকিৎসার টাকা নেই। এই আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থা এখন পর্যন্ত। এবং তাদেরকে উদ্দেশ্য করে প্রতিনিয়ত অবমাননাকর বক্তব্য রাখা হচ্ছে। ঠুস-ঠাস কোটা থেকে শুরু করে, নিশ্চয়ই আপনার নজরে এসেছে। তিনি তার ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা বলার সাথে সাথে গণমাধ্যমে দেখেছেন যে আজকে আপনার সংবাদ সম্মেলন, এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। এই অবমাননা তারা সহ্য করতে পারছেন না।’
এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, ‘কিছু করণীয় এই রাষ্ট্রের আছে কি না?’
তিনি শেষে বলেন, ‘যারা কোটা সংস্কার আন্দোলন করছেন, তারা সব সমাধান আপনার কাছে চান। তারা আদালতের পথে যেতে চান না। এবং সমাধান নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা রাখবেন না কোটা রাখবেন না?’
কেউ এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত না-ও হতে পারেন। কিন্তু, এমন একটি প্রশ্ন সংবাদ সম্মেলনে করা যায়। এতে সহিংসতার আহ্বান বা উসকানি কোনোটিই নেই। আইসিটির প্রসিকিউটররা যদি অন্য কিছু মনে করেন, তাহলে বাংলাদেশে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা যেকোনো সাংবাদিকই একইভাবে গ্রেপ্তার বা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
দীর্ঘ ও প্রসঙ্গান্তরে চলে যাওয়া জবাবের একপর্যায়ে শেখ হাসিনা এমন একটি মন্তব্য করেন, যা পরবর্তী সময়ে ওই সংবাদ সম্মেলনের মূল পরিচায়ক হয়ে ওঠে। ‘মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন’—এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা পাবে না। তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে? সেটা আমার প্রশ্ন। দেশবাসীর কাছেও প্রশ্ন। রাজাকারের নাতি-পুতিরা সব পাবে, মুক্তিযোদ্ধারা পাবে না। (তাদের) অপরাধটা কী?’
এর অর্থ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল, আন্দোলনকারীরা রাজাকারের নাতি-পুতি, অর্থাৎ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগীদের বংশধর। এর ফলে আরও বড় আকারে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা অপমানজনক এই মন্তব্যের জেরে উল্টো স্লোগান দেন, ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’
হাসিনার মন্তব্যটি ছিল উসকানিমূলক ও অপমানজনক এবং এটি এক বিরাট রাজনৈতিক ভুল হিসেবে প্রমাণিত হয়। এর ফলে আন্দোলন আরও জোরালো হয় এবং ব্যাপক জনসমর্থন পায়। কিন্তু হাসিনা যদি আরও এগিয়ে গিয়ে সহিংসতার উসকানিও দিতেন, এমনকি ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’দের ওপর হামলা করতেও বলতেন, তারপরও যে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি সেটা বলতেন, সেই সাংবাদিককে হাসিনার উত্তরের জন্য ফৌজদারি অপরাধে দায়ী করা যেত না। একজন রাজনীতিবিদ কোনো প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবেন, তার জন্য কোনো সাংবাদিক দায়ী নন।
কাজেই এমন অভিযোগের ভিত্তিতে এই তিন সাংবাদিককে আটক রাখার জন্য রাষ্ট্রপক্ষের প্রচেষ্টায় প্রশ্ন উঠছে, আইসিটি প্রসিকিউটরদের গতিপথ ঠিক কোন দিকে। কেননা, আইনস্বীকৃত সবচেয়ে গুরুতর অপরাধের বিচারে গঠিত একটি ট্রাইব্যুনালে তারা সংবাদ সম্মেলনে করা প্রশ্নকেও সেই পর্যায়ের অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।
এর আগেই ২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এই তিন সাংবাদিকের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তি হলো, হত্যাকাণ্ডের পর প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের কারণে তারাও ওই হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে গণ্য।
সংবাদ প্রতিবেদন তৈরি, এমনকি রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে করা প্রশ্নকেও যখন নৃশংস অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন নিশ্চিতভাবেই আইসিটি আর কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে না। এই আদালত সাংবাদিকতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো এবং প্রসিকিউটরদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধীদের হয়রানি করার হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
বহু বছর ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করেন ডেভিড বার্গম্যান। এক্সে তার হ্যান্ডল @TheDavidBergman
