আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: এক আলোকযাত্রার নাম

Date:

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জন্মদিন ২৫ জুলাই। এটি কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা সংগঠকের জন্মদিন নয়; বরং এমন এক মানুষের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করার দিন, যিনি বই, জ্ঞান ও মানবিকতাকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছেন।

একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা সাধারণত অর্থনীতি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। কিন্তু ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলে, কোনো জাতির স্থায়ী উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও মুক্তবুদ্ধির ওপর। এই সত্যটিকেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার কর্মজীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। তার বিশ্বাস ছিল, উন্নত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে আলোকিত নাগরিকের হাত ধরে, আর সেই আলোকপ্রাপ্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো বই। এই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই তার নেতৃত্বে অসংখ্য মানুষের শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠায় গড়ে উঠেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র—বাংলাদেশের এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে অল্প কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করেছে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাদের অন্যতম। এটি কেবল একটি সাহিত্যসংগঠন বা গ্রন্থাগার নয়; বরং পাঠাভ্যাস, আত্মশিক্ষা, সাংস্কৃতিক পরিশীলন, মানবিক শিক্ষা ও নাগরিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার একটি সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

তার সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত এই যে তিনি শিক্ষা ও সংস্কৃতিকে কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি; বরং সমাজের ভেতরের সৃজনশীল শক্তিকে সংগঠিত করে জ্ঞানচর্চাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ও আনন্দময় অনুষঙ্গে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। তার কাছে শিক্ষা ছিল না কেবল পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের উপায়; বরং আত্মগঠন, চরিত্র নির্মাণ এবং আজীবন শেখার এক অব্যাহত প্রক্রিয়া।

এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তিনি কয়েক প্রজন্মকে শেখানোর চেষ্টা করেছেন, একটি উন্নত রাষ্ট্র কেবল অবকাঠামো, অর্থনীতি বা প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; তার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয় জ্ঞান, মানবিকতা, নৈতিকতা ও মুক্তচিন্তায় সমৃদ্ধ নাগরিক গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। সেই অর্থে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার।

বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা, দুর্বল গ্রন্থাগার সংস্কৃতি এবং পাঠ্যবইয়ের বাইরের জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতা আজও শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং তার একটি অপরিহার্য পরিপূরক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

শিক্ষা যে কেবল তথ্য অর্জনের বিষয় নয়, বরং সমালোচনামূলক চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে ব্যক্তিত্ব বিকাশের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সেই ধারণাকে বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্র করে তুলেছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের আত্মশিক্ষার দর্শন তরুণদের একটা বড় অংশকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং নিজের বৌদ্ধিক বিকাশের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশের বহু পরিবারে এখনো পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার সংস্কৃতি সীমিত। এই বাস্তবতায় বিদ্যালয়ভিত্তিক বইপড়া কর্মসূচি, পাঠ প্রতিযোগিতা, বই-পর্যালোচনা এবং নির্বাচিত গ্রন্থপাঠের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বইকে পরীক্ষার উপকরণ থেকে জীবনবোধ ও আত্মগঠনের অনুষঙ্গে রূপান্তর করার প্রয়াস নিয়েছে। এর ফলে অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভাষাদক্ষতা, কল্পনাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং নৈতিক সংবেদনশীলতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এক অর্থে, এটি বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগও বটে।

আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যবর্তী এমন একটি পরিসর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সামাজিক আস্থা, সহযোগিতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ভিত্তি নির্মাণ করে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বইপড়া, সাহিত্য আলোচনা, বিতর্ক, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এমন একটি উন্মুক্ত পরিসর গড়ে তুলেছে, যেখানে ভিন্নমত, পেশা ও সামাজিক পটভূমির মানুষ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এ ধরনের উদ্যোগ নাগরিক সমাজকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মসূচি এর অন্যতম সৃজনশীল উদ্যোগ। এর দর্শন সহজ কিন্তু গভীর–পাঠককে বইয়ের কাছে নয়, বইকে পাঠকের কাছে নিয়ে যাওয়া। জ্ঞানকে বড় শহর কিংবা অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের, বিশেষত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস জ্ঞানের গণতন্ত্রীকরণের একটি কার্যকর উদাহরণ।

অবশ্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম এখনো দেশের সব অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে পারেনি। ডিজিটাল যুগে পাঠাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল লাইব্রেরি, অডিওবুক, অনলাইন পাঠচক্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠ-উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা, যা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আরও শক্তিশালীভাবে আসতে পারে। তবে এ কথাও সত্য যে আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের বাস্তবতা অনেক সময় এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

তবু এসব সীমাবদ্ধতা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিংবা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের গুরুত্বকে খাটো করে না। তাকে কেবল একজন জনপ্রিয় বক্তা, পরিবেশ আন্দোলনের উদ্যমী পুরুষ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপক, লেখক বা সাহিত্য আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে মূল্যায়ন করলে তার অবদানের প্রকৃত ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। শিক্ষাদর্শন, সমাজতত্ত্ব ও নাগরিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, তিনি এমন এক সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার লক্ষ্য ছিল জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলা।

২০০৪ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এশিয়ার নোবেলখ্যাত ‘র‍্যামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কারে ভূষিত হন। এর আনুষ্ঠানিক সাইটেশনের জবাবে তিনি বলেছিলেন—‘Little minds and great nations cannot go together. Consequently, our aspiration for greatness as a nation must be matched by our commitment to create enlightened people within the nation. And therefore, our endeavour is to create for Bangladesh an informed, enriched and committed generation of future citizens. In this, our focus has been on the youth.’

এই সংক্ষিপ্ত বক্তব্যেই তার সমগ্র জীবনদর্শনের সারমর্ম নিহিত। তিনি বিশ্বাস করেন, সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে কোনো জাতি মহৎ হতে পারে না। তাই তার আজীবনের সাধনা এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলা, যারা হবে জ্ঞানসমৃদ্ধ, মননশীল, মূল্যবোধে ঋদ্ধ এবং দায়িত্বশীল। তরুণদের প্রতি তার বিশেষ মনোযোগের পেছনেও আছে এই বিশ্বাস—একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয় তার আগামী প্রজন্মের চিন্তা, চরিত্র ও মূল্যবোধের মাধ্যমে।

আজ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল তথ্যপ্রবাহ মানুষের মনোযোগকে ক্রমেই খণ্ডিত করে তুলছে, তখন বইপড়া, গভীর চিন্তা এবং আত্মশিক্ষার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে কেবল তথ্য নয়, প্রয়োজন বিচক্ষণতা; কেবল মত নয়, প্রয়োজন বিচারবোধ; কেবল দক্ষতা নয়, প্রয়োজন মানবিকতা। এই নতুন বাস্তবতায় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনদর্শন ও কর্মযজ্ঞ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাই কেবল একজন শিক্ষক, লেখক বা সংগঠকের নাম নন; তিনি এক আলোকযাত্রার নাম। তার আজন্ম বিশ্বাস—একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার সম্পদে নয়, তার মানুষের মধ্যে নিহিত। তিনি মনে করেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। এই বিশ্বাসই তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, পাঠসংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের ইতিহাসে তার এই আলোকযাত্রা দীর্ঘদিন ধরে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

লেখক: শুভ কিবরিয়া, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share post:

Popular

More like this
Related

ভূমিকম্পে মৃতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা দেবে ঢাকা জেলা প্রশাসন

২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পে ম্তদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা...

রকস্টারের উত্থান-পতনের গল্প নিয়ে টিজারে শাকিব খান

কয়েকদিন আগে শাকিব খান অভিনীত ‘রকস্টার’ সিনেমার ৫৪ সেকেন্ডের...

ফিনল্যান্ডপ্রবাসী নারীর যৌতুক মামলায় পিরোজপুরের আজিমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

ফিনল্যান্ডে বসবাসরত এক প্রবাসী নারীর কাছে যৌতুক দাবি এবং...

বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করলো ব্রিটিশ ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ‘ভল্ট’

ব্রিটিশ ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ‘ভল্ট’ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে।...