ওটিপি প্রতারণা থেকে বাঁচতে যে ভুলগুলো কখনো করবেন না

Date:

একটি ফোনকল। ওপাশ থেকে পরিচিত ভঙ্গিতে কেউ বলছে, ‘আমি কাস্টমার কেয়ার থেকে বলছি। আপনার অ্যাকাউন্টে সমস্যা হয়েছে। এখনই একটি কোড যাবে, সেটি বলুন।’

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোনে একটি ছয় সংখ্যার কোড এলো। বার্তায় লেখা, এটি কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। তারপরও অনেকেই বলে ফেলেন।

প্রতারকের সবচেয়ে বড় সাফল্য এখানেই। তারা সব সময় প্রযুক্তি ভেঙে ঢোকে না; বরং মানুষকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলে, যেখানে ভয়ের মধ্যে বা তাড়াহুড়োয় সে নিজেই নিজের নিরাপত্তার দরজা খুলে দেয়।

ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড বা ওটিপি মূলত অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য তৈরি। ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-মেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে প্রবেশ, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন বা কোনো লেনদেন নিশ্চিত করার সময় এই কোড ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু কোডটি ভুল হাতে গেলে সেটিই আবার নিরাপত্তার দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

তাই ওটিপি-সংক্রান্ত প্রতারণা ঠেকাতে কয়েকটি ভুল কখনোই করা উচিত নয়।

ফোনে কাউকে ওটিপি বলবেন না

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। কেউ ব্যাংক, বিকাশ, নগদ, মোবাইল অপারেটর, কুরিয়ার প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিলেও ওটিপি বলা যাবে না।

প্রতারকেরা প্রায়ই এমন ভাষা ব্যবহার করে, যেন পরিস্থিতি জরুরি মনে হয়—অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে, টাকা আটকে গেছে, পরিচয় যাচাই করতে হবে, অথবা কোনো সুবিধা পেতে হলে দ্রুত কোড বলতে হবে।

এই তাড়াহুড়োটাই তাদের কৌশল।

কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠান আপনার গোপন ওটিপি জেনে আপনার হয়ে সেটি ব্যবহার করার কথা নয়। কোডটি এসেছে আপনার পরিচয় বা আপনার কাজ নিশ্চিত করতে, অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার জন্য নয়।

শুধু কোড নয়, পুরো বার্তাটি পড়ুন

অনেকে ওটিপি এলেই শুধু সংখ্যাটির দিকে তাকান। কিন্তু সেই বার্তার বাকি অংশে প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লেখা থাকে।

কোডটি কি নতুন কোনো যন্ত্রে প্রবেশ, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন, অর্থ লেনদেন, নাকি নতুন অ্যাকাউন্ট চালুর জন্য?

আপনি যদি এর কোনোটিই নিজে শুরু না করে থাকেন, তাহলে ধরে নিতে হবে কেউ আপনার তথ্য ব্যবহার করে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে।

এ অবস্থায় কোডটি কাউকে না জানিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা পরীক্ষা করা উচিত।

অপরিচিত কাউকে ফোনের নিয়ন্ত্রণ দেবেন না

প্রতারকেরা অনেক সময় বলে, আপনার ফোন বা অ্যাকাউন্টের সমস্যা ঠিক করতে একটি অ্যাপ ইনস্টল করতে হবে। এরপর তারা এমনভাবে নির্দেশনা দেয়, যেন দূর থেকেই আপনার ফোনের স্ক্রিন দেখতে বা ফোনটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এ অবস্থায় আপনার ফোনে আসা ওটিপি, ব্যক্তিগত বার্তা বা ব্যাংকিং তথ্য তাদের চোখে পড়ে যেতে পারে।

তাই অপরিচিত কারও কথায় অ্যানিডেস্ক, টিমভিউয়ার বা এ ধরনের দূর থেকে ফোন নিয়ন্ত্রণের অ্যাপ ইনস্টল করবেন না। আগে থেকেই এমন অ্যাপ থাকলেও অচেনা কাউকে সংযোগের অনুমতি দেবেন না।

বার্তায় পাওয়া লিংকে গিয়ে ওটিপি দেবেন না

প্রতারকেরা এখন এমন ওয়েবসাইট বানায়, যা দেখতে আসল ব্যাংক বা পরিচিত সেবার ওয়েবসাইটের মতোই।

এসএমএস, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ই-মেইলে লিংক পাঠিয়ে বলা হতে পারে—‘অ্যাকাউন্ট যাচাই করুন’, ‘পুরস্কার নিন’, ‘টাকা ফেরত পেতে তথ্য দিন’।

সেখানে প্রথমে ব্যবহারকারীর নাম বা পাসওয়ার্ড, এরপর ওটিপি চাওয়া হয়।

ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না, তিনি আসলে প্রতারকের তৈরি পাতায় নিজের সব তথ্য দিয়ে দিয়েছেন।

সন্দেহ হলে কোনো পাঠানো লিংক ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট নিজে খুলে কাজ করা নিরাপদ।

‘টাকা পেতে ওটিপি লাগবে’—এ কথা বিশ্বাস করবেন না

বাংলাদেশে অনলাইন কেনাবেচা ও মোবাইল আর্থিক সেবা ঘিরে এ ধরনের প্রতারণা বেশ পরিচিত।

কেউ বলতে পারে, ‘আপনাকে টাকা পাঠানো হয়েছে, গ্রহণ করতে ওটিপি বলুন।’

আবার কখনো বলা হয়, ‘রিফান্ড পেতে কোড লাগবে’, ‘ক্যাশব্যাক ছাড়তে হবে’, ‘সরকারি সহায়তার টাকা নিতে হবে’।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার—টাকা পাওয়ার জন্য কাউকে নিজের ওটিপি বলে দিতে হয় না।

ওটিপি সাধারণত কোনো কাজ অনুমোদন বা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই কেউ টাকা দেওয়ার আগে আপনার কোড জানতে চাইলে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত।

পরিচিত নাম বা নম্বর দেখেই কলটি বিশ্বাস করবেন না

ফোনে পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা নম্বরের নাম দেখালেই ধরে নেওয়া যাবে না যে কলটি সেখান থেকেই এসেছে।

প্রতারকেরা কখনো এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, যেন ফোনের পর্দায় অন্য কোনো নম্বর বা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম দেখায়। ফলে কলটি ব্যাংক, বিকাশ, নগদ কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বলে মনে হতে পারে।

তাই পরিচিত নাম দেখালেও কেউ ওটিপি চাইলে তা কখনোই জানাবেন না। সন্দেহ হলে কলটি কেটে দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল নম্বরে নিজে যোগাযোগ করুন।

কারণ ফোনের পর্দায় কী নাম দেখাচ্ছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কলটির সত্যতা আপনি নিজে যাচাই করেছেন কি না।

ভুল করে ওটিপি দিয়ে ফেললে সময় নষ্ট করবেন না

ভুল হয়ে গেছে বুঝতে পারার পর অনেকেই লজ্জা বা ভয় থেকে চুপ করে থাকেন। এতে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।

ওটিপি দিয়ে ফেললে যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন। ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার বিষয় হলে অফিসিয়াল গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করুন। অচেনা যন্ত্রে অ্যাকাউন্ট খোলা আছে কি না দেখুন এবং সন্দেহজনক প্রবেশ বন্ধ করুন।

একইসঙ্গে সাম্প্রতিক লেনদেনও পরীক্ষা করা জরুরি।

প্রতারণার ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক মিনিট অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আপনি কিছুই করেননি, তবু ওটিপি এলো?

এটিকেও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। আপনি কোনো অ্যাকাউন্টে ঢোকার চেষ্টা করেননি, কিছু কেনেননি, পাসওয়ার্ডও বদলাননি—তারপরও হঠাৎ ওটিপি এলে এর অর্থ হতে পারে কেউ আপনার ফোন নম্বর, ই-মেইল বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রবেশের চেষ্টা করছে।

একবার এমন হলে কোডটি উপেক্ষা করা যেতে পারে। কিন্তু একই ঘটনা বারবার হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদলানো এবং নিরাপত্তা সেটিং পরীক্ষা করা ভালো।

Share post:

Popular

More like this
Related

নতুন বেতন স্কেল: ভর্তুকি ও সরকারি ব্যয় কমানোসহ যত সুপারিশ

সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের খরচ মেটাতে জাতীয়...

৭০ বছর আগে যেভাবে তৈরি হয়েছিল ‘মুখ ও মুখোশ’

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে আজ এক গৌরবোজ্জ্বল দিন। এই দিনেই...

ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না, জনগণ সুযোগ কাজে লাগাবে: হেগসেথ

ইরাকের মতো ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান দীর্ঘস্থায়ী হবে না...

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী স্কোয়াড ঘোষণা

আসন্ন আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য শুক্রবার ১৫ সদস্যের শক্তিশালী...