কাফকার পৃথিবী, দস্তয়েভস্কির বিবেক: মানুষ এখনো যেখানে বন্দি

Date:

ব্যাটম্যান-সুপারম্যান, রিয়াল মাদ্রিদ-বার্সেলোনা, মেসি-রোনালদো, স্যামসাং-অ্যাপেল—কত ধরনের দ্বৈরথ বিশ্বজুড়ে। কিছু দ্বৈরথ আবার মনস্তাত্ত্বিকও হতে পারে। কখনো কখনো কিছু মানুষের মনস্তত্ত্বই হয়ে ওঠে দর্শন। সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনে বিশ্বাসী দুজন মানুষ যখন তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তারা পাঠকদের ফেলে দেয় মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে।

একজন প্রশ্ন করেন ‘আমি কী করেছি’? অন্যজন প্রশ্ন করেন ‘আমার সঙ্গে এমন কেন হচ্ছে’?

ধরা যাক, একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলেন, তিনি অভিযুক্ত। কী অপরাধ করেছেন, জানেন না। কে তাকে অভিযুক্ত করেছেন, তাও জানেন না। শুধু জানেন, তার বিরুদ্ধে কোথাও একটি মামলা চলছে।

আরেকজন মানুষ জানেন, ঠিক কী করেছেন তিনি। কোন পাপ করেছেন, কাকে আঘাত করেছেন, কোন সিদ্ধান্ত তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে—সবই জানেন। অথচ শাস্তি দেওয়ার জন্য কোনো আদালতের প্রয়োজন নেই। তার নিজের বিবেকই যথেষ্ট।

প্রথম মানুষটি কাফকার পৃথিবীতে বাস করেন, দ্বিতীয়জন দস্তয়েভস্কির। একজনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে অজানা পৃথিবীতে। অন্যজনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে নিজের ভেতরে। দুজনেরই পালানোর ইচ্ছে আছে। কিন্তু একজন জানেন না, পালাবেন কোথা থেকে। অন্যজন জানেন না, পালাবেন কার কাছ থেকে।

সম্ভবত এখানেই শুরু দস্তয়েভস্কি ও কাফকার সেই অসম্ভব দার্শনিক দ্বন্দ্ব—মানুষ কি পৃথিবীর হাতে বন্দি, নাকি নিজের আত্মার?

কখনো কখনো মনে হয়, জীবন যেন এমন এক অফিস, যেখানে আপনি প্রতিদিন হাজিরা দেন, কিন্তু কেউ আপনাকে কখনো বলে না যে, আপনার চাকরিটা আসলে কী। নিয়ম আছে, ফরম আছে, কর্তৃপক্ষ আছে, ই-মেইল আছে, শুধু পরিষ্কার উত্তর নেই।

আবার কখনো জীবন এতটাই ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে যে, কোনো অফিস, রাষ্ট্র কিংবা সমাজকে দায়ী করে আপনি বাঁচতে পারেন না। রাতের নীরবতায় নিজের বিবেকই তখন আপনার সবচেয়ে কঠিন বিচারক।

মানুষের এই দুই অভিজ্ঞতার দুই অসাধারণ সাহিত্যিক প্রতিরূপ হলেন ফিওদর দস্তয়েভস্কি ও ফ্রানৎস কাফকা।

দুজনের মধ্যে সরাসরি কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। তারা একই সময়ের মানুষও নন। দস্তয়েভস্কি মারা যান ১৮৮১ সালে, আর কাফকার জন্ম ১৮৮৩ সালে। তবু তাদের সাহিত্যকে পাশাপাশি রাখলে মনে হয়, তারা যেন একই মানুষের দুই প্রান্ত নিয়ে কথা বলছেন—একজন তাকিয়েছেন মানুষের ভেতরে, অন্যজন তাকিয়েছেন মানুষের চারপাশে।

আর সেই কারণেই তাদের নিয়ে ভাবা মানে অনেকটা নিজের জীবনের দুই ধরনের অন্ধকারের দিকে তাকানো।

কাফকার পৃথিবী: অপরাধটা কী, কেউ জানে না

কল্পনা করুন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলেন, আপনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আপনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন? কেউ উত্তর দিল না।

আপনি আদালতে গেলেন। সেখানে কিছু মানুষ আছেন, কিছু নিয়ম আছে, কিছু দরজা আছে। আপনি ব্যাখ্যা চাইছেন। কিন্তু যত বেশি জানতে চাইছেন, তত বেশি রহস্য তৈরি হচ্ছে।

এটাই কাফকার ‘দ্য ট্রায়াল’ এর জোসেফ কে’র পৃথিবী। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। কিন্তু অভিযোগটি কী, তা স্পষ্ট নয়। তার চারপাশে একটি বিশাল ব্যবস্থা কাজ করছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার নিয়মগুলো তার কাছে অদৃশ্য। তিনি পালাতে চান, ব্যাখ্যা চান, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। কিন্তু সমস্যা হলো, যে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি লড়ছেন, সেটিকে ঠিকমতো দেখতেই পাচ্ছেন না।

এখানেই কাফকায়েস্ক শব্দটির ভয়াবহতা।

এটি শুধু কোনো অস্বাভাবিক বা আমলাতান্ত্রিক পরিস্থিতি নয়। বরং এমন এক অবস্থা, যেখানে আপনি বুঝতে পারছেন কিছু একটা ভয়াবহভাবে ভুল, কিন্তু সেই ভুলের উৎস খুঁজে পাচ্ছেন না। আজকের পৃথিবীতে এই অভিজ্ঞতা খুব অপরিচিত নয়।

একটি ব্যাংক আপনার অ্যাকাউন্ট আটকে দিয়েছে। কেন? জানেন না। একটি অ্যালগরিদম আপনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট মানুষের সামনে দেখাচ্ছে না। কেন? জানেন না। চাকরির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কেন? জানেন না। একটি সরকারি দপ্তর আপনাকে আরেকটি দপ্তরে পাঠাচ্ছে। কেন? জানেন না। আপনি শুধু একটি অদৃশ্য ব্যবস্থার ভেতর ঘুরছেন।

কাফকার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক তাই শাস্তি নয়। আতঙ্ক হলো, আপনার বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা কাজ করছে, তার মুখ নেই।

দস্তয়েভস্কির পৃথিবী: বিবেকই যেখানে বিচারক

এবার দৃশ্যটা বদলে ফেলুন। আপনি জানেন কী করেছেন, কোথায় ভুল করেছেন। কেউ আপনাকে গ্রেপ্তার করেনি, পুলিশ দরজায় আসেনি, কোনো আদালত বসেনি। তবু আপনি ঘুমাতে পারছেন না। কারণ, আপনার নিজের বিবেক আপনাকে ছেড়ে দিচ্ছে না।

এখানেই দস্তয়েভস্কি প্রবেশ করেন।

‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ এর রোমানোভিচ রাস্কোলনিকভ মনে করেন, কিছু মানুষ হয়তো সাধারণ নৈতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন। একটি ভয়ংকর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি নিজের তত্ত্বকে পরীক্ষা করতে যান। তাত্ত্বিক অহংকারে বশে তিনি এক বৃদ্ধা অর্থলগ্নকারী ও তার বোনকে হত্যা করেন। কিন্তু হত্যার পর তার আসল শাস্তি শুরু হয়। আদালতে নয়, নিজের মাথার ভেতর।

কারণ, তিনি পালাতে পারেন, প্রমাণ লুকাতে পারেন, নিজেকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন, কিন্তু নিজের কাছ থেকে পালাতে পারেন না। দস্তয়েভস্কির কাছে মানুষের সবচেয়ে ভয়ংকর কারাগার কোনো জেলখানা নয়, বরং নিজের বিবেক।

তাই দস্তয়েভস্কির চরিত্ররা শুধু জানতে চায় না, ‘আমি কী করেছি?’ তারা জানতে চায়, ‘আমি আসলে কে?’

স্বাধীনতা আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ?

এখানেই তাদের সবচেয়ে গভীর পার্থক্যগুলোর একটি। কাফকার জগতে মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করলেও বাস্তবে অসংখ্য অদৃশ্য কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে।

আপনি কোথায় কাজ করবেন, কী কিনবেন, কী পড়বেন, কোন খবর দেখবেন—সবকিছুর ওপর অসংখ্য প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক কাঠামো, সামাজিক নিয়ম ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা প্রভাব ফেলছে। আপনি স্বাধীন। কিন্তু সেই স্বাধীনতার সীমানা কোথায়, জানেন না।

দস্তয়েভস্কি আবার উল্টো বিপদ দেখান। ধরুন, আপনাকে সত্যিই স্বাধীনতা দেওয়া হলো। কেউ আপনাকে থামাচ্ছে না। আপনি যা খুশি করতে পারেন। এখন? এখন আপনার সিদ্ধান্তের দায়ও আপনার। স্বাধীনতা তখন আর শুধু আনন্দ নয়, স্বাধীনতা মানে দায়িত্ব। আর দায়িত্ব মানেই অপরাধবোধের সম্ভাবনা।

এই জায়গায় দস্তয়েভস্কির মানুষ কাফকার মানুষের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক অবস্থায় পড়েন। কারণ, তিনি বলতে পারে না, তার কিছু করার ছিল না। তিনি জানেন, সিদ্ধান্তটি তারই ছিল। একজনের শত্রু চলমান ব্যবস্থা, অন্যজনের শত্রু নিজের ছায়া।

কাফকার চরিত্রকে আপনি একটি বিশাল ভবনের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের মতো কল্পনা করতে পারেন। তিনি দরজা খুঁজছেন। একটি দরজা পেলে আরেকটি আসে। একটি নিয়ম বুঝলে আরেকটি নিয়ম সামনে আসে। যত বেশি চেষ্টা, গোলকধাঁধা তত বড় হয়।

দস্তয়েভস্কির চরিত্র যেন একটি ঘরের মধ্যে বসে আছে। দরজা খোলা, বাইরে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু যেতে পারছেন না। কারণ, তার সঙ্গে বসে আছেন তিনি নিজেই।

এই দুই ছবিই আধুনিক মানুষের গভীর সংকটের দুটি প্রতীক। একদিকে, আমরা এমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাস করি যেগুলোর নিয়ম আমরা তৈরি করিনি। অন্যদিকে, আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের বোঝাও আমাদেরই বহন করতে হয়।

আজকের পৃথিবীতে কেন এই দুজন আরও প্রাসঙ্গিক? এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে লেখা তাদের বই আজও কেন এত পরিচিত মনে হয়? কারণ, পৃথিবী হয়তো বদলেছে, কিন্তু মানুষের ভয় খুব বেশি বদলায়নি।

আজকের মানুষ হয়তো কাফকার মতো কোনো অজানা আদালতে দাঁড়িয়ে নেই, কিন্তু অ্যালগরিদমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তার জীবনকে মূল্যায়ন করছেন পারফরমেন্স রিভিউ, ক্রেডিট স্কোর, ফলোয়ার কাউন্ট এবং অসংখ্য অদৃশ্য ম্যাট্রিক্সে। অনেক সময় তিনি জানেনই না, কেন একটি সুযোগ পেলেন না। শুধু জানেন তিনি বাদ পড়েছেন। এ যেন আধুনিক ‘দ্য ট্রায়াল’।

আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নিজের সবচেয়ে কঠিন বিচারকও মানুষ নিজেই। অন্যের সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে হয়; পুরোনো সিদ্ধান্ত মনে পড়ে; একটি ভুল সম্পর্ক, ভুল কথা, ভুল সিদ্ধান্ত বারবার মাথায় ফিরে আসে। কেউ তাকে শাস্তি দিচ্ছে না, নিজেই নিজেকে দিচ্ছে।

গভীরভাবে চিন্তা করলে তারা আসলে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়ান না। বরং মানুষের অস্তিত্বের দুই দিক আলোকিত করেন। কাফকা আমাদের বলেন, তোমার চারপাশের পৃথিবী সবসময় যুক্তিসংগত নয়। এমন ব্যবস্থার মধ্যেও তুমি আটকে যেতে পারো, যার নিয়ম তুমি কখনো বুঝবে না। আর দস্তয়েভস্কি বলেন, ঠিক আছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তোমাকে নিজের সিদ্ধান্তের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে।

কাফকা আমাদের শেখান অসহায়ত্বের ভাষা। দস্তয়েভস্কি শেখান দায়িত্বের ভাষা।

কাফকার মানুষ জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার সঙ্গে এমন কেন হচ্ছে?’ দস্তয়েভস্কির মানুষ জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি এমন মানুষ হলাম কীভাবে?’

আর সম্ভবত আধুনিক মানুষকে দুই প্রশ্নই করতে হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একটু কাফকা, একটু দস্তয়েভস্কি।

সকালে অফিসে যাওয়ার পথে আমরা কাফকা। অদৃশ্য ডেডলাইন, নিয়ম, অ্যালগরিদম, আমলাতন্ত্র—সবকিছুর মধ্যে পথ খুঁজি। রাতে একা ঘরে ফিরে আমরা দস্তয়েভস্কি। দিনের কথাগুলো মনে করি, কাকে কী বলেছি, কী বলা উচিত ছিল, কোথায় ভুল করেছি—সেসব হিসাব করি।

দিনে আমরা পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করি। রাতে লড়াই করি নিজের সঙ্গে। সম্ভবত এ কারণেই দস্তয়েভস্কি ও কাফকা এত আলাদা হয়েও এত কাছের। একজন আমাদের নিয়ে যান মানুষের আত্মার অন্ধকারে, অন্যজন নিয়ে যান মানুষের তৈরি পৃথিবীর অন্ধকারে। একজনের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ, অন্যজনের দরজা ভেতর থেকে।

আর আমরা? আমরা সেই দুই দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। হয়তো চাবি আমাদের হাতেই। শুধু আমরা জানি না কোন দরজার চাবি কোনটি।

Share post:

Popular

More like this
Related

নতুন বাংলাদেশ পুরাতন ফর্মুলায় চলবে না: জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, 'দেশের আপামর জনগণ...

বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমছে, আবারও দাম বাড়াতে চায় কোম্পানিগুলো

ঢাকা ও দেশের কয়েকটি জেলার ব্যবসায়ীরা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে...

প্রথমবার একসঙ্গে আরিফিন শুভ–কেয়া পায়েল

প্রথমবারের মতো জুটি হয়ে অভিনয় করছেন আরিফিন শুভ ও...

ইরানের ৫ শহরে বিস্ফোরণের শব্দ

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের অন্তত পাঁচটি...