জাপানি বিনিয়োগ টানতে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি: জাইকা প্রেসিডেন্ট

Date:

বাংলাদেশে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা দেখছে জাপান। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাক সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো। 

গত ২ জুলাই দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেছেন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকো। তার ভাষায়, ‘জাপানি কোম্পানিগুলো অনিশ্চয়তা পছন্দ করে না।’

তানাকা গত ১ জুলাই ঢাকা সফরে আসেন। আজ রোববার তার বাংলাদেশ ছাড়ার কথা। এই সফরকালে তিনি ২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

এ ছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কয়েকজন মন্ত্রী ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

তানাকা বলেন, বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ ও জাপান উভয় দেশই জাপানের সহায়তায় চলমান বড় প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মেট্রোরেলের বিভিন্ন এমআরটি লাইন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বন্দর-সংযুক্ত যোগাযোগ অবকাঠামো ও অন্যান্য কৌশলগত বিনিয়োগ প্রকল্প।

সাক্ষাৎকারে জাপানের অর্থায়নে নির্মিত অবকাঠামো প্রকল্পের মান নিয়েও কথা বলেন তানাকা। তার মতে, এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য অনেক বেশি।

তিনি জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সেখানে বাংলাদেশের ভূমিকা, জাইকার ঋণের সুদের হার বাড়ার কারণ, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রভাব ও বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) নিয়েও আলোচনা করেন।

তানাকা বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী। তার মতে, সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়লে আরও বেশি জাপানি বিনিয়োগ আসবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ প্রায় ৪০ কোটি ডলারের বেশি। দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৪০ থেকে ৩৫০টি জাপানি কোম্পানি ব্যবসা করছে।

জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের আগে কয়েকটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা।

তানাকার ভাষায়, বিশ্বের অনেক দেশের বিনিয়োগকারীর তুলনায় জাপানি কোম্পানিগুলো বেশি সতর্ক।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) ব্যবসার পরিবেশকে আরও অনুকূল করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো যত শক্তিশালী হবে, ব্যবসা পরিচালনা তত সহজ হবে।

তবে তিনি বলেন, আরও বেশি জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আনতে হলে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সুশাসনেরও উন্নতি প্রয়োজন।

বড় প্রকল্পে কেন দেরি

জাইকা প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কয়েকটি বড় প্রকল্পের কাজ ধীর হয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫ উল্লেখযোগ্য।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এসব বিষয়ে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে কোনো মৌলিক মতবিরোধ নেই। তার ভাষায়, সার্বিকভাবে সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো মতপার্থক্য নেই। উভয় পক্ষই চায় টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হোক, যাতে নির্মাণকাজ এগিয়ে যায়।

তার মতে, এমন বিলম্ব শুধু বাংলাদেশেই নয়। অন্যান্য দেশেও সরকারি প্রকল্পে বিভিন্ন ধাপের যাচাই-বাছাইয়ে সময় লাগে। তবে জাইকার প্রত্যাশা ছিল, ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়া আরও দ্রুত শেষ হবে।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার আশা, সরকার ও জাইকা একসঙ্গে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধান করবে।

ব্যয় নয়, মান বিবেচনা করতে হবে

জাপানের অর্থায়নে প্রকল্পের ব্যয় বেশি—এমন সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করেন তানাকা। তিনি বলেন, আমরা মনে করি না জাপানের অর্থায়নে প্রকল্প ব্যয়বহুল।

তার মতে, শুধু ব্যয় নয়, প্রকল্পের মান ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলও বিবেচনায় নিতে হবে। একই মানের প্রকল্প হলে তখন ব্যয়ের তুলনা করা যেতে পারে। কিন্তু জাপানের প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে বেশি সুবিধা দেয়।

তিনি উদাহরণ হিসেবে ঢাকার মেট্রোরেলের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, মানুষ মেট্রোরেলকে আরামদায়ক ও সুবিধাজনক মনে করছে। এটি আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়।

তার মতে, এমআরটি লাইন-৬-এর সাফল্যই উচ্চমানের অবকাঠামোয় বিনিয়োগের গুরুত্ব প্রমাণ করে।

ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশের গুরুত্ব

তানাকা বলেন, জাপানের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।

তার মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ধীরে ধীরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চলে আসছে। জাপানও এই পরিবর্তনের অংশ হতে চায়।

বাংলাদেশ আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তানাকার মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে পণ্য পরিবহনে জট তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানে শক্তিশালী একটি গভীর সমুদ্রবন্দর প্রয়োজন। আর সে কারণেই মাতারবাড়ী প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, আগে জাপান বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করে বড় আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল। এতে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

এ ছাড়া নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে নিয়েও উত্তর-দক্ষিণ করিডরের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সেই পরিকল্পনা কার্যত থেমে গেছে। তিনি এটিকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেন।

জাইকার ঋণের সুদ কেন বাড়ছে

জাইকা প্রেসিডেন্ট বলেন, বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে ঋণের সুদের হার সমন্বয় করা ছাড়া উপায় ছিল না। তবে শুধু সুদের হার দেখলেই হবে না। ঋণের পরিশোধের সময় ও গ্রেস পিরিয়ডও বিবেচনা করতে হবে।

তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধের সুবিধা থাকলে কিছুটা বেশি সুদ হলেও সেই ঋণ এখনো সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 

তিনি ব্যক্তিগতভাবে আরও সহজ শর্তে ঋণ দিতে চান। তবে একই সঙ্গে জাইকার আর্থিক সক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ

তানাকা বলেন, কোভিড-১৯ ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাসহ বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।

তার মতে, এখন সামষ্টিক অর্থনীতির আরও উন্নতি, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, কর আদায় বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা দরকার। সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী।

তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অর্থনীতিকে আরও বহুমুখী করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে হবে।

সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্ব খুবই শক্তিশালী। আগামী বছরগুলোতেও আমরা এই সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চাই।

Share post:

Popular

More like this
Related

জনগণ মোটেও আতঙ্কিত না, এভরিথিং ইজ ভেরি নরমাল: ডিএমপি কমিশনার

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলেও...

উদ্বোধনী ম্যাচেই স্ট্রিমিং বিপর্যয়ে দর্শকদের ক্ষোভ, প্ল্যাটফর্মগুলোর দুঃখ প্রকাশ

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ সম্প্রচারের সময় বাংলাদেশে বিভিন্ন...

যুক্তরাষ্ট্রের গম টনপ্রতি ২৪ ডলার বেশি দিয়ে কিনছে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির আওতায় প্রতি টন গম...

রেশন পাচার মামলায় নুসরাত জাহানকে তলব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের  (টিএমসি) সাবেক এমপি...