পিংক বাসের শহর ও গ্রামে খাসি খাওয়া বর

Date:

দেশে যাত্রা শুরু করেছে গোলাপি রঙের বাস। এই খবর গণপরিবহনে কী মাত্রা যোগ করবে তা ছাপিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাওর হয়েছে রঙ ও চালকের লিঙ্গীয় পরিচয়। এমন প্রশ্নও উঠেছে, আজ পিংক বাস, এরপর কি সড়কের রঙও পিংক হবে?

প্রশ্নের মূল আসলে বাসের রং বা চালক ও সহকারীর লিঙ্গীয় সত্তা নয়। বিআরটিসির ১৪টি ‘পিংক বাস’ চালুর উদ্যোগটির প্রতীকী অর্থ তাই বাসের রঙের চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু সড়কের রঙ পিংক হবে কি না, এমন প্রশ্ন আমাদের ঘরে নারীর অবস্থানকে আড়াল করছে। আমরা শহরের রাস্তায় নারীর জন্য যে জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছি, ঘরের ভেতরেও কি তার জন্য একই মাপের জায়গা তৈরি করছি?

গত ১৮ আগস্ট ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় নারী চালক ও সহকারী নিয়ে চালু হয়েছে পিংক বাস। একজন নারী যখন বাসের চালকের আসনে বসেন, তিনি শুধু একটি বাস চালান না; তিনি সেই পুরোনো ধারণাটিকেও চ্যালেঞ্জ করেন—কিছু কাজ, কিছু জায়গা, কিছু দায়িত্ব কেবলই পুরুষের জন্য।

কিন্তু প্রায় একই সময়ের আরেকটি ঘটনাও এখানে প্রাসঙ্গিক। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বিয়ের অনুষ্ঠানে বরের জন্য দেওয়া ‘খদরে’ খাসি না থাকায় বেশ হইচই হয় এবং কনের বাবার হস্তক্ষেপে তাকে বিয়ে না করেই ফিরে যেতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ঘটনার জেরে পুনরায় জানা যায়, পরদিনই ওই বর অন্য একজনকে বিয়ে করেছেন। এবার অবশ্য বরের পাতে নিশ্চিত করা হয়েছিল ‘আস্ত খাসি’।

ঘটনাটি নিয়ে হাসাহাসি হয়েছে, মিম হয়েছে, নানা মন্তব্য হয়েছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। ঘটনাটি একইসঙ্গে অদ্ভুত, বিস্ময়কর এবং আমাদের সামাজিক বাস্তবতার কিছু অস্বস্তিকর দিক সামনে আনে। তবে একটু থেমে প্রশ্ন করা যায়, বিষয়টি কি সত্যিই শুধু খাসি খাওয়ার আকাঙ্ক্ষার?

পিংক বাস ও খাসির দুটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে কিছু বাস্তবতা সামনে আসে। নারীকে জনপরিসরে আরও দৃশ্যমান করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। এই গোলাপি রঙের স্বস্তির বিপরীতে কিন্তু খাসি খাওয়ার বুবুক্ষ সত্তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা নারীর অবমূল্যায়নের সূত্রগুলো ঢাকা যাবে না। ঘরের ভেতর বা পরিবারে নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগহীনতা কিছু ক্ষোভ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এর উত্তর খুঁজতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক পার্থক্যের ভেতরে—অধিকার থাকা এবং সেই অধিকার প্রকৃত অর্থে প্রয়োগ করতে পারার মধ্যকার পার্থক্য।

অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সক্ষমতা তত্ত্ব এই পার্থক্যটিকেই তার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন করে তোলে। তার যুক্তি হলো, একজন মানুষের আনুষ্ঠানিক অধিকারের তালিকা দিয়ে তার প্রকৃত স্বাধীনতা মাপা যায় না। সেটা মাপা যায় তার ‘ফাংশনিং’ দিয়ে। অর্থাৎ তিনি বাস্তবে কী হতে পারেন এবং কী করতে সক্ষম, তার মধ্য দিয়ে। অধিকার আর সক্ষমতার মধ্যে যে ফাঁক থাকে, অমর্ত্য সেন সেই ফাঁকটিকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন বলে চিহ্নিত করেছেন।

একজন নারী আইনিভাবে বিয়ে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখেন। এটি কাগজে-কলমে সত্য। কিন্তু সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক নির্ভরতা ও অর্থনৈতিক অসহায়ত্বের কারণে সেই অধিকার বাস্তবে প্রয়োগ করার সক্ষমতা তার নাও থাকতে পারে। অধিকার কাগজে থাকলেও সক্ষমতা বাস্তবে না থাকলে সেই অধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। এটিই অমর্ত্য সেনের তত্ত্বের মূল কথা।

পিংক বাস ও খাসির ঘটনা পাশাপাশি রাখলে এই তাত্ত্বিক পার্থক্যটি অস্বাভাবিক রকম স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পিংক বাস নারীকে এক নতুন সক্ষমতা দিচ্ছে। নিরাপদে চলাচলের সক্ষমতা। এখানে রাষ্ট্র শুধু অধিকার ঘোষণা করেনি, বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগের অবকাঠামোও তৈরি করেছে—বাস দিয়েছে, রুট ঠিক করেছে, চালক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ফাংশনিং এখানে সরাসরি অধিকারের সঙ্গে মিলে গেছে। কারণ, রাষ্ট্র মাঝখানের দূরত্বটি নিজে ভরাট করে দিয়েছে।

কিন্তু বিয়ের প্রশ্নে নারীর সেই একই ধরনের সক্ষমতা কোথায়? তার ‘অধিকার আছে’ বলা সহজ, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করার মতো অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কি তার হাতে আছে? আখাউড়ার মেয়েটির ক্ষেত্রে অবমাননাকর শর্ত প্রত্যাখ্যান করার সক্ষমতা এসেছিল বাবার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে, নিজের সক্ষমতা হিসেবে নয়। অর্থাৎ ‘নারী বাস চালাতে পারেন’ আর ‘নারী অবমাননাকর বিয়ের শর্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারেন’, এই দুটি বাক্য দেখতে একই রকম মনে হলেও তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্নস্তরের দাবি করে। প্রথমটিতে সক্ষমতা রাষ্ট্রনির্মিত এবং নারীর নিজস্ব। দ্বিতীয়টিতে সক্ষমতা ধার করা, শর্তসাপেক্ষ এবং অন্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।

এই নির্ভরতার প্রকৃতি বোঝার জন্য প্রশ্ন করা দরকার, একই সামাজিক বাস্তবতায় বাস করেও দুজন বাবা কেন দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিলেন? আখাউড়ার ঘটনায় দুজন মেয়ের বাবাকে আমরা দেখতে পাই। প্রথম মেয়েটির বাবা সামাজিক চাপের বিপরীতে দাঁড়িয়ে মেয়েকে ওই বরের সঙ্গে বিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। অথচ ঠিক একই সামাজিক পরিস্থিতিতে ছেলেটির সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়েতে অন্য একজন বাবা আস্ত খাসি জোগাড় করলেন।

দুজন বাবাই একই সমাজে বাস করেন, একই সামাজিক প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে যান। তবু একজন প্রত্যাখ্যান করলেন, আরেকজন মেনে নিলেন। অমর্ত্য সেনের কাঠামোয় এই বৈপরীত্যের অর্থ স্পষ্ট—মেয়ের মর্যাদা রক্ষা পাবে কি না, তা সমাজে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে কোন বাবার হাতে সিদ্ধান্তের ভার পড়ছে তার ওপর। যেখানে ব্যক্তিগত সাহস একটি অধিকারের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে বুঝতে হবে অধিকারটি আসলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুপস্থিত এবং সক্ষমতা ব্যক্তিভেদে লটারির মতো বণ্টিত হচ্ছে। এক পরিবারে মেয়ের মর্যাদা জেতে, আরেক পরিবারে হেরে যায়। অথচ দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট প্রায় একই।

আমাদের সমাজে এমন পরামর্শ খুব অস্বাভাবিক নয় যে, ‘আরে একটা খাসি জোগাড় করে দাও, বিয়েটা তো আর ভাঙা যায় না’। কারণ, মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেলে সামাজিক দায়, লজ্জা, আত্মীয়স্বজনের কথা সবকিছুর চাপ কেবল মেয়ের পরিবারের ওপরই পড়ে। ‘বিয়ে তো একবারই হয়’, ‘এতটুকু বিষয় নিয়ে বিয়ে ভাঙা ঠিক না’, ‘মেয়েকে একটু মানিয়ে নিতে বলো’—এই বাক্যগুলোর মধ্যে সমাজ কীভাবে নারীকে মর্যাদা দিয়ে থাকে তা বোঝা যায়।

প্রকৃত অর্থে, এগুলো সক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার ভাষা। প্রত্যাখ্যানের আইনি অধিকার অস্বীকার না করেই তার প্রয়োগকে অসম্ভব করে তোলার কৌশল। যে বাবা প্রত্যাখ্যান করলেন, তিনি মূলত নিজেই হয়ে উঠলেন মেয়ের সক্ষমতার সাময়িক বিকল্প। আর যে বাবা মেনে নিলেন, তিনি কোনো দুর্বল মানুষ নন, বরং এমন একটি কাঠামোর ভেতর সিদ্ধান্ত নিলেন যেখানে মেনে নেওয়াটাই স্বাভাবিক পথ বলে বিবেচিত হয় এবং প্রত্যাখ্যান করাটাই ব্যতিক্রম।

প্রশ্নটা তাই কেবল ব্যক্তির সাহস নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো, একটি সমাজের মর্যাদা কি কারো ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করা উচিত? নাকি এটি এমন একটি সক্ষমতায় পরিণত হওয়া উচিত, যা প্রতিটি নারীর নিজস্ব, যার জন্য কোনো ব্যতিক্রমী বাবার প্রয়োজন পড়ে না?

নারীবাদী রাষ্ট্রদার্শনিক ক্যারল পেটম্যান দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র ‘পাবলিক’ ও ‘প্রাইভেট’ পরিসরের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে রাখে। যার ফলে রাষ্ট্র ও পরিবার আলাদা। তাইতো কে বাস চালাবে তা রাষ্ট্র করতে পারে, কিন্তু বিয়ের টেবিলে কে কী দাবি করবে সেই প্রশ্নে রাষ্ট্রের মুখে কুলুপ আঁটা থাকে। ফলে যে পরিসরে নারীর সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হয়, ঠিক সেই পরিসরেই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের হাত সবচেয়ে কম পৌঁছায়।

একইভাবে, আমরা শুধু এমন একটি সমাজ চাই না যেখানে নারীরা নারীর জন্য বরাদ্দকৃত বাস চালাতে পারবেন। আমরা এমন একটি সমাজ চাই যেখানে একজন নারী জীবনের সিদ্ধান্তেও নিজের আত্মমর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারবেন এবং এর জন্য তাকে একজন ব্যতিক্রমী বাবার সাহসের ওপর নির্ভর করতে হবে না।

ফাতিমা আমিন: সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Share post:

Popular

More like this
Related

নির্বাচনের বাজেট নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই: অর্থ উপদেষ্টা

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ...

ইত্যাদি’র নতুন পর্বে কী থাকছে

বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ এবার প্রাচীন জনপদ নরসিংদীতে। রায়পুরা উপজেলার...

মিশরে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ১৮

মিশরের উত্তর পূর্বাঞ্চলের পোর্ট সাইদ প্রদেশে ট্রাক ও যাত্রীবাহী...

নিলামে বিপুল খরচ করা মোস্তাফিজদের কলকাতায় আছেন যারা

মিনি নিলাম থেকে তিনজন ক্রিকেটার কিনতেই কলকাতা নাইট রাইডার্সের...