ক্ষেপণাস্ত্র বনাম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, কত দিন চলবে প্রতিযোগিতা

Date:

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এখন মূলত দুটি দৃশ্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইরানের ছোঁড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হচ্ছে। অন্যদিকে সেগুলোকে প্রতিহত করতে আকাশে ছুটে যাচ্ছে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র।

বার্তা-সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপট।  

ওপেন-সোর্স গোয়েন্দা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান মিন্টেল ওয়ার্ল্ডের তথ্যের বরাতে এএফপি জানায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই দিনেই সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের দিকে চারশ ক্ষেপণাস্ত্র ও এক হাজার ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরান।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মেরিন কর্মকর্তা স্কট বেনেডিক্ট এএফপিকে বলেন, ‘এটা আসলে কার অস্ত্রভাণ্ডার বেশি তার প্রতিযোগিতা। যেন দুই তীরন্দাজ একে অপরকে তীর ছুঁড়ছে, শেষ পর্যন্ত যার তীর আগে ফুরাবে, সে হারবে।’

কতদিন টিকবে আকাশ প্রতিরক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন জানান, সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে এবং শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদ প্রায় সীমাহীন এবং এ দিয়ে দীর্ঘসময় যুদ্ধ চালানো সম্ভব বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে বাস্তবে এসব প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতদিন কার্যকর রাখা যাবে—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘তীর নয়, তীরন্দাজকে লক্ষ্য’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন লঞ্চার বা উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাগুলো ধ্বংসে মনোযোগ দিচ্ছে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, এই যুদ্ধ মূলত ‘তীর নয়, তীরন্দাজকে গুলি করার’ কৌশল।

গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধ শেষে ধারণা করা হয়েছিল, ইসরায়েলে আঘাত হানতে সক্ষম কয়েকশ থেকে প্রায় দুই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হাতে ছিল।

এ ছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছাতে সক্ষম স্বল্পপাল্লার বিপুল ক্ষেপণাস্ত্র এবং তুলনামূলক কম খরচের ড্রোনও রয়েছে তাদের ভাণ্ডারে।

ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্র বলছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দ্রুত বাড়ছিল।

তবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক লঞ্চার গত বছর যুদ্ধের সময় ধ্বংস করা হয় এবং বাকিগুলো এখন লক্ষ্যবস্তু।

ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা, দীর্ঘ যুদ্ধের চাপ

ফ্রান্সভিত্তিক ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চের গবেষক এতিয়েন মারকুজ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘনত্ব কম দেখা যাচ্ছে।

তার প্রশ্ন—ইরান কি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংরক্ষণ করছে, নাকি বড় আকারের সমন্বিত হামলা চালানোর সক্ষমতা কমে গেছে?

তবে হামলা কম হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যে আঘাত হানছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা পুরোপুরি অপ্রবেশযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে কমপক্ষে দুটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়। এসব ইন্টারসেপ্টর অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সীমিত সংখ্যায় উৎপাদিত হয়।

এএফপি জানায়, বছরে মাত্র ৯৬টি থাড মিসাইল এবং প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য প্রায় ৬০০টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি হয়।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে প্রায় ১৫০টি থাড মিসাইল ব্যবহার করে ইসরায়েল।

এই মজুত দীর্ঘ সময় টিকবে না বলে সতর্ক করেছেন মারকুজ।

তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য দ্রুত ইরানের উৎক্ষেপণ সক্ষমতা ধ্বংস করা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।

তার মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা অসম্ভব।

রাজনৈতিক সমাধান না আসলে ইয়েমেনের হুতিদের মতোই ইরানও দীর্ঘ সময় ধরে কম মাত্রার কিন্তু স্থায়ী চাপ বজায় রাখতে পারে বলে মনে করেন গবেষক এতিয়েন মারকুজ।

Share post:

Popular

More like this
Related

ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি ট্যুর শুরু, বাংলাদেশে কবে আসবে

বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনার পারদ চড়িয়ে মরুর বুকে নামল সোনালী...

খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ারে তিন বাহিনীর প্রধান

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে দেখতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে গিয়েছেন...

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়ছেন যারা

রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর...

‘শবনম ছিলেন স্কুলজীবনের স্বপ্নের নায়িকা, পরে তার নায়ক হয়েছিলাম’

ষাটের দশকের অন্যতম সেরা, সফল ও রোমান্টিক নায়িকা শবনম।...