গাছ লাগানোর সাফল্য নয়, বাঁচানোর হিসাব চাই

Date:

বর্ষাকাল এলেই আব্বা আমাকে নিয়ে নওগাঁর গ্রামের বাড়িতে আম, কাঁঠালসহ নানা ফলদ গাছের চারা লাগাতে বের হতেন। কাদামাটির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি জায়গা বেছে নিতেন, চারা রোপণ করতেন, তারপর বছরের পর বছর সেগুলোর পরিচর্যা করতেন। নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, বাঁশের খুঁটি দিয়ে গাছকে সুরক্ষা দেওয়া ছিল তার অভ্যাস। তখন বুঝিনি কিন্তু আজ উপলব্ধি করি, আব্বা আমাকে শুধু গাছ লাগানো নয়, দায়িত্ব, ধৈর্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার শিক্ষা দিচ্ছিলেন। আজও যখন গাছ লাগাই, মনে হয় আব্বার সেই শিক্ষা ও দায়িত্বেরই একটি ছোট অংশ পালন করছি।

কৈশোরে আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে গ্রামবাংলায় বৃক্ষরোপণ ও খাল খননের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে দেখেছি। পরে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও পল্লী উন্নয়ন ও সবুজায়নকে জাতীয় কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছিলেন। তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে উভয়েই সঠিক ছিলেন। একটি দেশের উন্নয়ন শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা ভবন নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। গাছ, নদী, উর্বর জমি ও সবুজ প্রকৃতিও একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির ভিত্তি।

আজ সরকারের ২৫ কোটি গাছ রোপণের উদ্যোগ আমাকে আব্বার সেই শৈশবের শিক্ষার কথাই মনে করিয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, সবুজ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার এক ঐতিহাসিক সুযোগ।

তবে একটি প্রশ্ন অবশ্যই করতে হবে—পাঁচ বছর পর এই ২৫ কোটি চারার কতটি জীবিত থাকবে? আর এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে কর্মসূচিটির প্রকৃত সাফল্য।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন আর গাছ লাগানো নয়, বরং রোপণ করা গাছগুলোকে বাঁচিয়ে পরিপক্ব গাছে পরিণত করা। একটি চারা রোপণ করতে কয়েক মিনিট লাগে, কিন্তু একটি গাছ বড় হতে লাগে বছরের পর বছর। সেই সময়জুড়ে প্রয়োজন পরিচর্যা, সুরক্ষা, পরিকল্পনা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জবাবদিহিতা।

এখন সময় এসেছে আমাদের জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের—গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচানো হোক বাংলাদেশের জাতীয় আন্দোলন।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সময়ে দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে পরিপক্ব গাছ কমে যাচ্ছে। জাতীয় বন জরিপ অনুযায়ী, দেশের বনভূমি মোট ভূমির মাত্র ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই বাস্তবতায় গাছ কোনো বিলাসিতা নয়, বরং আমাদের প্রাকৃতিক অবকাঠামো। গাছ তাপমাত্রা কমায়, বায়ু বিশুদ্ধ করে, কার্বন শোষণ করে, জলাবদ্ধতা ও মাটিক্ষয় কমায় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। তাই রাস্তা ও সেতুর মতো গাছেও বিনিয়োগ করতে হবে। পার্থক্য হলো, একটি সুস্থ গাছের মূল্য সময়ের সঙ্গে আরও বৃদ্ধি পায়।

সেইসঙ্গে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সাফল্য কেবল রোপিত চারার সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। প্রকৃত সাফল্যের সূচক হওয়া উচিত কতটি গাছ বেঁচে আছে, কতটি পরিপক্ব হয়েছে, কোথায় বৃক্ষ আচ্ছাদন বেড়েছে এবং মানুষ ও পরিবেশ কতটা উপকৃত হয়েছে। অর্থাৎ, সংখ্যা নয়, ফলাফলই হবে সাফল্যের মানদণ্ড। আর সেই ফলাফল নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জবাবদিহিতা।

কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় নীতি, অর্থায়ন ও লক্ষ্য নির্ধারণ করবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় জাতীয় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু প্রকৃত সফলতা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে জেলা, উপজেলা ও স্থানীয় সরকারকে।

এর জন্য সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার বৃক্ষরোপণ, গাছের টিকে থাকার হার ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের অগ্রগতি নিয়ে প্রতি বছর একটি সংক্ষিপ্ত বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন। একইভাবে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নিজ নিজ এলাকার বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা, গাছের টিকে থাকার হার ও বৃক্ষ আচ্ছাদনের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেন।

প্রতিবেদনে শুধু রোপণ করা গাছের হিসাব থাকবে না, বরং কতটি গাছ এক বছর, তিন বছর ও পাঁচ বছর পরও বেঁচে আছে, কতটি পরিপক্ব হয়েছে, কোথায় বৃক্ষ আচ্ছাদন বেড়েছে, কোথায় গাছ নষ্ট হয়েছে এবং তা পুনরুদ্ধারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও থাকবে। জাতীয় পর্যায়েও বৃক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, জিআইএস ও ডিজিটাল মানচিত্র ব্যবহার করে সার্বিক তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করা আজ আর মোটেই কঠিন নয়।

অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, যা পরিমাপ করা হয়, তা ব্যবস্থাপনা করা যায়; আর যা ব্যবস্থাপনা করা যায়, তা উন্নত করা সম্ভব। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও এই নীতি সমানভাবে প্রযোজ্য। যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন সবচেয়ে ভালো করবে, তাদের জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে। আবার যেখানে গাছের টিকে থাকার হার কম হবে, সেখানে কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

গাছ শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনৈতিক সম্পদ

গাছ শুধু পরিবেশ রক্ষার উপাদান নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পদ। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশের জন্য আম, কাঁঠাল, লিচু, নারকেল, সুপারি, পেয়ারাসহ ফলদ গাছ বহু বছর ধরে খাদ্য, পুষ্টি ও আয় নিশ্চিত করতে পারে। একটি ভালোভাবে পরিচর্যা করা পরিপক্ব ফলদ গাছ প্রতি বছর হাজার হাজার টাকা আয় দিতে পারে। কয়েকটি সুস্থ গাছই একটি পরিবারের জন্য সময়ের সঙ্গে কয়েক লাখ টাকার সম্পদে পরিণত হতে পারে।

গাছ শুধু ফল দেয় না; সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা অন্য যেকোনো জরুরি সময়ে একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি হতে পারে। একইসঙ্গে ফলদ ও বনজ গাছ স্থানীয় অর্থনীতি, ক্ষুদ্র শিল্প, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যতের সবুজ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।

তাই ২৫ কোটি গাছের কর্মসূচি শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়, লাখো পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি সবুজ সম্পদ গড়ে তোলার জন্য জাতীয় বিনিয়োগ।

প্রতিটি গাছের জন্য প্রয়োজন অভিভাবক

প্রতিটি রোপিত গাছের একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক থাকা উচিত। এই অভিভাবক হতে পারেন একজন শিক্ষার্থী, একটি পরিবার, একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অথবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। স্কুল ও কলেজে ‘আমার গাছ, আমার দায়িত্ব’ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু গাছ লাগানো নয়, গাছ বাঁচানোর দায়িত্বও নেয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশে আনুমানিক ৬ কোটির বেশি তরুণ গোষ্ঠী রয়েছে। প্রত্যেকে যদি মাত্র পাঁচটি গাছের দায়িত্ব নেয় এবং সেগুলো বাঁচিয়ে বড় করে, তাহলে প্রায় ৩০ কোটি গাছ নিরাপদ ভবিষ্যৎ পেতে পারে। প্রযুক্তিতে দক্ষ এই প্রজন্ম মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে গাছের অবস্থান, ছবি ও পরিচর্যার তথ্য সংরক্ষণ করে একটি জাতীয় ডিজিটাল বৃক্ষ মানচিত্র তৈরিতেও নেতৃত্ব দিতে পারে।

কাজেই সরকার, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় সংগঠন ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে ২৫ কোটি গাছের কর্মসূচি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ নাগরিকভিত্তিক সবুজ আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কংক্রিট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি সত্যিকার উন্নত দেশ সেটাই, যেখানে মানুষ বিশুদ্ধ বায়ু পায়, শহরগুলো বাসযোগ্য থাকে এবং প্রকৃতি উন্নয়নের অংশীদার হয়।

একটি গাছ মানে ভবিষ্যতের জন্য একটি উপহার। আজ বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ এসেছে। ২৫ কোটি গাছের উদ্যোগকে সফল করতে হলে এটিকে জাতীয় বৃক্ষ পরিচর্যা আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সরকার এখানে নীতি ও নেতৃত্ব দেবে, স্থানীয় সরকার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠন অংশীদার হবে, আর প্রতিটি পরিবার অন্তত একটি গাছের দায়িত্ব নেবে। তাহলেই শুরু হবে বাংলাদেশের প্রকৃত সবুজ বিপ্লব।

আর সেজন্যই আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হোক—একটি গাছ লাগাব, একটি গাছ বাঁচাব, একটি গাছ বড় করব।

ময়নুল হক: অস্ট্রেলীয় অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশেষজ্ঞ; মাল্টিকালচারাল অস্ট্রেলিয়ায় অবদানের জন্য মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া (ওএএম) প্রাপ্ত।

Share post:

Popular

More like this
Related

বিদেশের পড়াশোনার খরচ এখন ব্যাংকের কার্ডেই দেওয়া যাবে

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এখন থেকে নির্ধারিত ডেবিট, ক্রেডিট বা প্রিপেইড...

পাপারাজ্জিদের আচরণে ক্ষুব্ধ সালমান খান

বলিউড অভিনেতা সালমান খান মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালের বাইরে পাপারাজ্জিদের...

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খুব কাছাকাছি...

বিজয় দিবসে মিরাজের ‘অদম্য’ ও শান্তর ‘অপরাজেয়’ দলে যারা খেলবেন

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স অ্যাসোশিয়েশন (কোয়াব)'র আয়োজনে...