ইলেকট্রনিক লেনদেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে চেক সংগ্রহ, বহন ও ব্যাংকে গিয়ে টাকা জমা দেওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়ার পরও একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অজানা থেকে যেতে পারে—এই টাকা কে পাঠিয়েছেন?
প্রতিটি ইলেকট্রনিক লেনদেনে অর্থদাতার নাম বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করা উচিত। একই সঙ্গে প্রাপকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা জমার বিবরণীতে সেই নাম দেখানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সরকারি ও বেসরকারি, উভয় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনেই এ সমস্যা দেখা যায়। কিছু ব্যাংকের স্টেটমেন্টে অর্থদাতার পরিচয় উল্লেখ থাকে, ফলে হিসাব মেলানো সহজ হয়।
অন্য ব্যাংকের স্টেটমেন্টে শুধু সাধারণ বিবরণ বা ব্যাংকের নাম দেখা যায়। একসঙ্গে অনেক লেনদেন গ্রহণ করে, এমন কোনো প্রতিষ্ঠানকে তখন প্রতিটি জমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক ও চালানের তথ্য মিলিয়ে দেখতে হয়। অর্থদাতার পরিচয় না থাকলে টাকা জমা হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের হিসাব অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।
সম্প্রতি আমার পর্যালোচনা করা একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের উদাহরণ দেই। জুন মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনে সেখানে বিভিন্ন অঙ্কের একাধিক সরকারি ইলেকট্রনিক ফান্ডস ট্রান্সফার (ইএফটি) জমা হয়েছিল। প্রতিটি লেনদেনের বিবরণ প্রায় একই ছিল—‘ইএফটি ইনফ্লো//মতিঝিল/ট্রেজারি এস/গভর্নমেন্ট’।
টাকার পরিমাণ ও লেনদেন নম্বর দেখা গেলেও কোন সরকারি দপ্তর টাকা পাঠিয়েছে, তার উল্লেখ ছিল না। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ক্ষেত্রেও জমার বিবরণীতে অর্থদাতা প্রতিষ্ঠানের নাম না থাকলে একই সমস্যায় পড়তে হয় প্রাপককে।
এর বাস্তবিক পরিণতি সহজেই বোঝা যায়। হিসাব বিভাগ টাকা জমা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠান টাকা পাঠিয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে পারে না।
এর বাস্তবিক পরিণতি সহজেই বোঝা যায়। হিসাব বিভাগ টাকা জমা হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করতে পারলেও কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে টাকা জমা হয়েছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করতে পারে না।
এ অবস্থায় কর্মীদের অর্থ পাঠানোর বিবরণ চাইতে হয়, বকেয়া বিলের সঙ্গে জমার পরিমাণ মিলিয়ে দেখতে হয় এবং ব্যাংক বা অর্থ পাঠানো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। কখনো সহজেই হিসাব মিলে যায়, আবার কখনো একাধিক বিলের অঙ্ক কাছাকাছি হওয়ায় হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
টাকা পরিশোধ করার পরও হিসাব না মেলা পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বকেয়া তালিকায় থেকে যেতে পারে। এমনকি একই বিলের বিপরীতে আবারও টাকা পরিশোধের অনুরোধ জানানো হতে পারে। এতে দুই প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি ঘটার আশঙ্কা থাকে।
অর্থবছরের শেষে এ সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিপুলসংখ্যক জমার পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে সেগুলোর হিসাব মেলানো কঠিন হয়। এর ফলে আর্থিক প্রতিবেদনে আয় কম দেখানো, পাওনার হিসাবে অসংগতি এবং বছরশেষের নিরীক্ষায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অর্থদাতার নামের মতো একটি তথ্যের অভাব শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীর নির্ভরযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
নিজের কাজেও ইএফটির সুবিধা দেখতে পাই। যেমন দূরের কোনো জেলার সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সংবাদপত্র ছোট কোনো বিজ্ঞাপনের বিল পেতে পারে। আগে ১০ হাজার টাকার একটি চেক সংগ্রহ করতে কাউকে ওই দপ্তরে পাঠাতে হতো। এরপর কুরিয়ারে চেকটি ঢাকায় আনতে হতো এবং অন্য কোনো সহকর্মীকে সেটি ব্যাংকে জমা দিতে বলতে হতো।
ইলেকট্রনিক লেনদেন এসব ঝামেলার অনেকটাই দূর করেছে। কিন্তু পরে সেই টাকা কে পাঠিয়েছে, তা শনাক্ত করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করতে হলে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধার একটি বড় অংশই ম্লান হয়ে যায়।
এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত প্রতিটি ইলেকট্রনিক লেনদেনে অর্থদাতার নাম উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারি দপ্তরের পরিচয় দিতে হবে। লেনদেন শুরুর সময়ই নামটি নথিভুক্ত করতে হবে এবং পুরো লেনদেন প্রক্রিয়ায় তা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। প্রাপকের ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা জমার বিবরণীতেও নামটি দেখাতে হবে।
নামের ঘর ফাঁকা রাখা গেলে, সেখানে শুধু ‘সরকার’ লেখা হলে কিংবা অর্থদাতার নামের পরিবর্তে শুধু ব্যাংকের নাম দেখানো হলে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।
বিল বা চালানের নম্বর উল্লেখ করা হলে প্রাপকের পক্ষে সংশ্লিষ্ট লেনদেনের হিসাব মেলানো আরও সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর উচিত লেনদেন নম্বর দিয়ে সহজে লেনদেনের তথ্য খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা করা। তবে এসব অতিরিক্ত তথ্য অর্থদাতার নামের বিকল্প হতে পারে না।
প্রত্যেক প্রাপকের জানার সুযোগ থাকা উচিত, কে টাকা দিয়েছেন। টাকা সরকারি দপ্তর থেকে আসুক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে, সব ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া দরকার।
লেনদেনের পরবর্তী হিসাব-নিকাশসহ পুরো প্রক্রিয়া সহজ হলেই ডিজিটাল ব্যবস্থার সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব। অর্থদাতার নাম স্পষ্টভাবে দেখা গেলে প্রেরক ও প্রাপক, উভয় পক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। অর্থদাতার পরিচয় বাধ্যতামূলক করা সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।
লেখক: হেড অব অপারেশনস এবং সিএফও, দ্য ডেইলি স্টার
