নীতিমালা আছে, ব্যাংকের এমডিদের কি সুরক্ষা দিতে পারছে বাংলাদেশ ব্যাংক?

Date:

কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) পদত্যাগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের শুনানি গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

গত এক বছরে ডজনেরও বেশি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদত্যাগ বা অপসারিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো শুনানি করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে— অভ্যন্তরীণ চাপে ব্যাংক নির্বাহীদের পদত্যাগ করা থেকে সুরক্ষা দিতে নীতিমালা থাকলেও সেগুলো কি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে?

উদাহরণ হিসেবে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিমিয়া সাদাতের কথা বলা যেতে পারে। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে গত ৬ মে তিনি পদত্যাগ করেন। পূর্ণকালীন এমডি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পাওয়ার আগেই তিনি ব্যাংকটি ছেড়ে দেন।

যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, গতকাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে তাকে ডাকেনি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন ওই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চাপে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তবে সাদাত এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেননি।

পদত্যাগের পেছনে কোনো চাপ ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না। পর্ষদের একজন সদস্য এ ব্যাপারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। নিজের সম্মান বজায় রাখতে আমি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছি।’

সাদাতের ঘটনার চেয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খানের পদত্যাগ বেশি আলোচনায় আসে। ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন ২৪ মে পদত্যাগ করেন ফারুক খান। ওই সময়ে তিনি দেড় মাসের ছুটিতে ছিলেন।

একই দিনে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও স্বতন্ত্র পরিচালক এম জুবাইদুর রহমানও পদত্যাগ করেন। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবি) তাদের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়।

নেতৃত্বে এই পরিবর্তনের ফলে গ্রাহকদের মধ্যে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং প্রায় দুই সপ্তাহ ব্যাংকের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যেও বিতর্ক হয়।

শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক) এমডি ও চেয়ারম্যানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, খান পদত্যাগ করার প্রায় এক মাস পার হয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাকে শুনানির জন্য ডাকেনি।

গতকাল এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দ্য ডেইলি স্টার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

সব পদত্যাগই চাপের কারণে নয়

গত এক বছরে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সব পদত্যাগের পেছনেই যে অভ্যন্তরীণ চাপের অভিযোগ ছিল, বিষয়টি তা নয়।

কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা অন্য ব্যাংকে যোগ দেওয়ার জন্য পদ ছেড়েছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন পদত্যাগের পর বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

গত বছরের মে মাসে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ইস্তফা দেন সেলিম আর এফ হোসেন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পদত্যাগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রাইম ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হাসান ও রশিদ পদত্যাগ করেন এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।

এর আগে গত বছরের আগস্টে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মারুফ। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, পদত্যাগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তাকে ডেকেছিল।

এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রথমে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয় এবং পরে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদত্যাগ করলে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সাধারণত তাদের শুনানির জন্য ডেকে থাকে। তবে কমিউনিটি ব্যাংক এবং ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ডাকা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।

নীতিমালা আছে, তবুও সংশয়

২০১৪ সালে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নিয়োগ ও দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে ২০২৪ সালে এ বিষয়ে একটি মাস্টার সার্কুলার জারি করা হয়।

ওই নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা যদি তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন, তবে পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশসহ সেই আবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে।

এরপর কোনো সুপারিশ করার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত শুনানি নিতে হয়। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ব্যাংকের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে থাকেন এমডি, আর পরিচালনা পর্ষদ মূলত নীতি নির্ধারণ করে।

তিনি আরও বলেন, পর্ষদের অনুমোদনের প্রয়োজন এমন যেকোনো প্রস্তাব এমডিকেই উপস্থাপন করতে হয়। আবার পর্ষদ কোনো বিষয় অনুমোদন করলে তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও এমডির ওপরই বর্তায়। ফলে পরিচালনা পর্ষদ ও এমডির মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে কখনো সহযোগিতা থাকে, আবার কখনো তৈরি হয় চাপা উত্তেজনা।

তিনি বলেন, এই টানাপোড়েনের কারণেই অনেক সময় ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের ওপর পদত্যাগের চাপ তৈরি হয়।

তিনি আরও যোগ করেন, বিদ্যমান নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কার্যকর সুরক্ষা দিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও এমডিদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।’

‘এর ফলে, কোনো এমডি যদি পর্ষদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ না করেন, তবে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় অথবা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘এমডিদের সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন, তবে এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাও জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই যদি দুর্বল হয়, তবে তারা এমডিদের রক্ষা করবে কীভাবে? তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার বিষয়টি এখন সময়ের দাবি।’

Share post:

Popular

More like this
Related

চারুকলা আমাদের শেকড়: বিপাশা হায়াত

অভিনয়শিল্পী বিপাশা হায়াতের চেয়ে চিত্রশিল্পী বিপাশা হায়াত এখন বেশি...

বিপ্লবী গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা ইইউ’র, দাঁতভাঙা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের

সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংস ভূমিকার অভিযোগে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী...

সিদ্ধান্ত বদলে থেকে যাচ্ছেন সালাউদ্দিন, মেয়াদ বাড়ছে আশরাফুলেরও

দলের বাজে পারফরম্যান্সের জেরে সিনিয়র সহকারি কোচের পদ ছেড়ে...

রাজধানীতে মাসে গড়ে ২০ খুন, ১০ মাসে ১৯৮: ডিএমপি

রাজধানী ঢাকায় গত ১০ মাসে ১৯৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।আজ...