ফুলবাড়ীর যে শিক্ষা বিএনপির মনে রাখা উচিত

Date:

সম্প্রতি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘এখন আমরা ফুলবাড়ী এবং অন্যান্য স্থানে ওপেন-পিট কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি। কারণ আমাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।’

অথচ ২০ বছর আগে ২০০৬ সালের ৩০ আগস্ট বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ৬ দফা চুক্তি করেছিল। সেখানে তারা সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছিলো—ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের আর কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলা হবে না।

বর্তমান বিএনপি সরকার যদি মনে করে জ্বালানি সংকটের দোহাই দিয়ে সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করবে, তাহলে সেটা হবে মারাত্মক ভুল ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। কেন ভুল, তা বুঝতে হলে ২০০৬ সালে ফুলবাড়ী আন্দোলনের কথা স্মরণ করা দরকার।

কেন ফুলবাড়ীর মানুষ উন্মুক্ত খননের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল

অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিএইচপি মিনারেলস ফুলবাড়ীর কয়লাখনিটি আবিষ্কার করে। বিশ্বের অন্যতম বড় খনন কোম্পানি হিসেবে তারা ওই এলাকার ভূতাত্ত্বিক জটিলতা, কৃষিনির্ভরতা, বন্যাপ্রবণতা, নদী-খাল এবং ঘনবসতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়।

কোম্পানিটি বুঝতে পেরেছিল, এখানে কয়লা উত্তোলন করলে বড় ধরনের পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই তারা খননকাজ শুরু করেনি। পরে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৯৯৮ সালে তারা খনি খননের অভিজ্ঞতা না থাকা নবগঠিত ‘এশিয়া এনার্জি’র কাছে লাইসেন্স হস্তান্তর করে বাংলাদেশ ত্যাগ করে।

এশিয়া এনার্জি (বর্তমান জিসিএম রিসোর্সেস) ৬৬ দশমিক ৮৮ বর্গকিলোমিটার জমি নিয়ে একটি বড় উন্মুক্ত কয়লাখনি করার পরিকল্পনা করে। কোম্পানির পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ সালে তারা কাজ শুরু করে এবং ২০০৫ সালে তা আরও জোরদার করে। ফুলবাড়ী, বিরামপুর, পার্বতীপুর ও নবাবগঞ্জ এলাকায় জনসমর্থন আদায়ের জন্য তারা প্রচারও চালায়।

কিন্তু স্থানীয় মানুষ প্রকল্পটি মেনে নেয়নি। তাদের আশঙ্কা ছিল, এতে কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ধ্বংস হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশকে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি দিয়ে কয়লা বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাতেও তারা আপত্তি জানায়।

জীবিকা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পরিবেশ—সব দিক থেকেই ফুলবাড়ীর মানুষের কাছে প্রকল্পটি সুযোগের চেয়ে বড় হুমকি মনে হয়েছিল।

শুরু হলো আন্দোলন 

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ‘ফুলবাড়ী শহর রক্ষা কমিটি’ গঠন করেন। পরে আশপাশের গ্রামগুলোও এতে যুক্ত হলে সংগঠনটির নাম হয় ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’। তারা স্মারকলিপি, মিছিল, অনশন, হরতালসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে।

এক পর্যায়ে স্থানীয় জনগণের আগ্রহে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, গঠিত হয় জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা। এর ফলে ফুলবাড়ী উন্মুক্ত কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন জাতীয় মাত্রা পায়।

জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ২০০৬ সালের মার্চে ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী পর্যন্ত রোডমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের সমর্থন আদায়ে এশিয়া এনার্জি প্রচার, তদবিরসহ নানা তৎপরতা চালাতে থাকে। কিন্তু ফুলবাড়ীর মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ও কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে অনড় থাকেন।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ‘উন্মুক্ত না, রপ্তানি না, বিদেশি না’ স্লোগানে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন প্রায় এক লক্ষ মানুষ। তখন কোম্পানিটিকে ফুলবাড়ীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে এক দিনের মধ্যে এলাকা ছাড়ার দাবি জানানো হয়।

সমাবেশের শেষদিকে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। এতে নিহত হন আমিন, তরিকুল ও সালেকিন, যারা সবাই ছিলেন কিশোর ও তরুণ।

এই হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে। ফুলবাড়ীতে অনির্দিষ্টকালের হরতাল শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও প্রতিবাদ ও সংহতি আন্দোলন জোরদার হয়।

একপর্যায়ে ফুলবাড়ী ও আশপাশের এলাকা কার্যত আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ৩০ আগস্ট সরকার বাধ্য হয় আন্দোলনকারীদের সাত দফা দাবি মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করতে।

সরকার তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ফুলবাড়ীসহ বাংলাদেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি করা হবে না। এশিয়া এনার্জির সঙ্গে করা সব চুক্তি বাতিল করা হবে এবং কোম্পানিটিকে এলাকা ছেড়ে যেতে হবে।

ফুলবাড়ী বাংলাদেশকে কী থেকে বাঁচিয়েছিল 

ফুলবাড়ীর আন্দোলন শুধু একটা এলাকার মানুষকে রক্ষা করেছিল—বিষয়টি এমন নয়। এর ফলে গোটা উত্তরবঙ্গই ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।

প্রথম বড় সমস্যা ভূগর্ভস্থ পানি। ফুলবাড়ী-বড়পুকুরিয়ার কয়লার স্তরের ওপর রয়েছে ৮০ থেকে ১২০ মিটার পুরু ডুপিটিলা পানির স্তর। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে কয়লার উপরের স্তরকে পানি শূন্য করতে হতো।

২০০৬ সালে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে সরকার গঠিত একটি কমিটি আশঙ্কা করেছিল, খনির আশপাশের ৩১৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যেতে পারে।

২০১২ সালে সাবেক পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বাধীন মোশাররফ কমিটিও সতর্ক করেছিল। তাদের মতে, খনির ২৭ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত এলাকায় নলকূপ, অগভীর পাম্প ও গভীর নলকূপ থেকে কৃষি ও গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ভূগর্ভের গঠন বিশ্বের অনেক কয়লা উৎপাদনকারী এলাকার চেয়ে আলাদা। অনেক দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কয়লার স্তরের নিচে থাকে। তাই সেখানে কয়লা তুলতে ভূগর্ভস্থ পানি সরানোর প্রয়োজন হয় না।

কিন্তু বাংলাদেশে পানির স্তর কয়লার স্তরের ওপরে। এ কারণেই ফুলবাড়ীর পরিস্থিতি আলাদা। মোশাররফ কমিটি ভারতের নেইভ্যালি লিগনাইট মাইনের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিল। সেখানে পানির স্তর কয়লার স্তরের নিচে। ফলে ফুলবাড়ীর মতো পানি ব্যবস্থাপনার জটিলতা সেখানে নেই।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা মানুষের উচ্ছেদ। এশিয়া এনার্জির হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য অন্তত ৬৬ দশমিক ৮৮ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করতে হতো। এর মধ্যে খনির জন্য লাগত ৫৪ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার। এতে ১২ হাজার ৩১২টি পরিবার বা ৫৪ হাজার ৭৪ জন মানুষকে তাদের বসতভিটা ছাড়তে হতো।

তবে মোশাররফ কমিটির হিসাব ছিল আরও ভয়াবহ। তাদের মতে, প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।

যদি প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হলে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে এত মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে পুনর্বাসন করা আরও কঠিন।

তৃতীয় সমস্যা কৃষিজমি ও খাদ্যনিরাপত্তা। এশিয়া এনার্জির হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির মধ্যে ৪২ দশমিক ৩৪ বর্গকিলোমিটার ছিল কৃষিজমি।

কয়লা খনন শুরু হলে জমির উপরের উর্বর মাটি তুলে ফেলতে হবে। এতে বহু বছরের তৈরি মাটির উর্বরতা নষ্ট হবে। পাশাপাশি মাটি বা ওভার বার্ডেন রাখার জন্য জায়গা এবং জলাধারের জন্য আরও ২৬ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার কৃষিজমি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যাবে।

আয়তনের দিক থেকে এই জমি প্রায় পুরো দিনাজপুর শহরের সমান। নুরুল ইসলাম কমিটি এটিকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেছিল।

চতুর্থ সমস্যা কর্মসংস্থান। প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার জমি অধিগ্রহণ করে বিপুলসংখ্যক কৃষক, বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীর জীবিকা নষ্ট হলেও প্রকল্পটিতে শুরুতে মাত্র প্রায় ২ হাজার ১০০টি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল। দীর্ঘমেয়াদে এই সংখ্যা কমে দাঁড়ানোর কথা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০-তে।

তার ওপর খনিতে কাজের জন্য বিশেষ ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন। ফলে যারা জমি ও জীবিকা হারাতেন, তাদের অনেকেই এসব চাকরির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হতেন না।

পঞ্চম বড় সমস্যা পরিবেশ। কয়লাবাহী স্তরে ২ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত সালফার রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এর পরিমাণ ২০ শতাংশ পর্যন্ত। খনন করা হলে অ্যাসিড মাইন ড্রেনেজ তৈরি হতে পারে। এর ফলে তামা, সিসা ও পারদের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানিতে মিশে পানি দূষিত করে ফেলতো।

নুরুল ইসলাম কমিটি বলেছিল, শক্তিশালী পরিবেশগত প্রতিষ্ঠান ও কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রও এই ধরনের দূষণ পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি। দেশটির কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে হাজার হাজার মাইল নদী অ্যাসিড মাইন ড্রেনেজের কারণে দূষিত হয়েছে।

আবার কেন ফুলবাড়ীর দিকে নজর?

উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনন করলে বড় ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে—এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এ কারণে আবারও ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লাখনি করার চেষ্টা হলে স্থানীয় মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন, এমন সম্ভাবনাই বেশি। তারপরও সময় সময় ফুলবাড়ীতে খনি করার পক্ষে জনসমর্থন তৈরির চেষ্টা দেখা যায়।

তবে এবার যুক্তিটা বদলে গেছে। একসময় এশিয়া এনার্জি বলত, কয়লা রপ্তানি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে। এখন বলা হচ্ছে, দেশে কয়লা উত্তোলন করলে আমদানি করা কয়লার ওপর নির্ভরতা কমবে।

বাংলাদেশ যখন একের পর এক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করছিল, তখন আমদানি করা কয়লাকে সস্তা বিদ্যুতের উৎস হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। যদিও তখনই স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর এর ক্ষতির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। এখন আমদানি করা কয়লার ওপর সেই নির্ভরতাকেই দেশে কয়লা উত্তোলনের যুক্তি হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।

অর্থাৎ যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য একসময় সস্তা আমদানি করা কয়লার কথা বলে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল, এখন সেই আমদানির খরচকেই দেশের ভেতরে কয়লা তুলে কৃষিজমি, পানির উৎস ও মানুষের জীবিকা ধ্বংস করার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

সমালোচকেরা অনেক দিন ধরেই এই কৌশল নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, শুরুতে বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মুলা ঝোলানো হবে। পরে সেই কয়লা আমদানির বাড়তি খরচ দেখিয়ে দেশে কয়লা উত্তোলনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন তারা।

বর্তমান সরকার জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের কথা বলছে। কিন্তু কয়লা খননের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে না। অথচ সরকারের নিয়োগ দেওয়া একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটি বহু আগেই এসব ঝুঁকির কথা জানিয়েছে।

কার স্বার্থে আবার উন্মুক্ত কয়লাখনি?

ফুলবাড়ীতে আবার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খননের তৎপরতার পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থও স্পষ্ট। এশিয়া এনার্জি বা জিসিএম রিসোর্সেস ফুলবাড়ী প্রকল্পে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের কথা রাখঢাক করছে না।

কোম্পানিটির খননকাজের কোনো আইনি অনুমোদন নেই। তাদের কাছে শুধু একটি মেয়াদোত্তীর্ণ অনুসন্ধান লাইসেন্স রয়েছে। তারপরও ফুলবাড়ী কয়লাখনিকে দেখিয়ে লন্ডনের অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেট থেকে কোম্পানিটি কয়েক মিলিয়ন পাউন্ডের শেয়ার বিক্রি করেছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে ১৬ জানুয়ারি আরও এক মিলিয়ন পাউন্ড এবং ১১ ফেব্রুয়ারি ১ দশমিক ২৫ মিলিয়ন পাউন্ড পুঁজি সংগ্রহ করে কোম্পানিটি। শেয়ারহোল্ডারদের জানানো হয়, ফুলবাড়ী-সংক্রান্ত কার্যক্রমে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর জিসিএমের শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। কোম্পানিটিও সরকারের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।

জিসিএম কয়লা উত্তোলনে সহযোগিতার জন্য চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানি পাওয়ার কনস্ট্রাকশান করপোরেশন অব চায়না লিমিটেডের (পাওয়ার চায়না) সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক এবং এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের ইপিসি কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর করেছে।

পাওয়ার চায়নার বাংলাদেশের দুটি বেসরকারি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অংশীদারত্ব রয়েছে। এগুলো হলো বাঁশখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের এসএস পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং ৩৫০ মেগাওয়াটের বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটি কেন্দ্রই ফুলবাড়ীর কয়লা কিনতে আগ্রহী।

এ ছাড়া সরকারকে অনুমোদন দিতে রাজি করানোর কাজে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট ডিজিআই ইনফ্রাটেক প্রাইভেট লিমিটেডকেও নিয়োগ করেছে জিসিএম। এসব যোগাযোগের মধ্য দিয়ে আবার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খননের পেছনে করপোরেট স্বার্থের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়ে যদি বর্তমান বিএনপি সরকার এসব ব্যবসায়িক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে আবারও বড় ভুল করার পথে এগোবে।

বাংলাদেশের বিকল্প আছে

বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বিকল্প কখনোই ছিল না, এ কথা ঠিক নয়। দেশে যেসব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সেগুলো ইতোমধ্যেই পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর নানা ধরনের চাপ তৈরি করছে।

শুধু এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে তুলনামূলক কম দামে কয়লা সরবরাহ করার জন্য বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও পানির উৎস ধ্বংস করা কোনোভাবেই টেকসই জ্বালানি নীতি হতে পারে না।

বাংলাদেশের উচিত বরং দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া এবং দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো।

কয়লা ও এলএনজির পেছনে যত বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করা হবে এবং এসব বিকল্পকে যত বেশি অবহেলা করা হবে, চলমান জ্বালানি সংকট থেকে বেরিয়ে আসা তত কঠিন হবে।

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন। 

[email protected]

Share post:

Popular

More like this
Related

৫ জুলাই আমির খানের বিয়ের গুঞ্জন, পাত্রী কে?

বলিউডে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন অভিনেতা আমির খান।...

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ১২

লেবাননের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের পৃথক হামলায় অন্তত ১২...

সুযোগ কাজে লাগালেন খাওয়াজা, দলের চাপে কেয়ারির দারুণ সেঞ্চুরি

উসমান খাওয়াজার খেলার কথা ছিলো না। ম্যাচের আগে অসুস্থ...

সাড়ে ৫ ঘণ্টার চেষ্টায় কড়াইল বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে

রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তির আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে পুরোপুরি...