নব্য উদারবাদ (নিওলিবারেলিজম) ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদ প্রভাত পাটনায়েক। একইসঙ্গে গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিকল্প উন্নয়নপথের সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
দ্য ডেইলি স্টার: কয়েক দশক ধরে অনেক উন্নয়নশীল দেশ বিশ্বে সস্তা শ্রম ও কাঁচামাল সরবরাহ করে আসছে, আর ধনী দেশগুলো ভোগ করেছে তৈরি পণ্য। এই মডেল কি এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে? বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য উত্তেজনা ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নতা যখন বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে রূপ দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সামনে এগুলো কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও একইসঙ্গে সুযোগ তৈরি করছে?
প্রভাত পাটনায়েক: গত কয়েক দশক ধরে নব্যউদার (নিউলিবারেল) অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এতে দেশের সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে পণ্য, সেবা এমনকি অর্থ ও পুঁজির তুলনামূলক অবাধ চলাচল নিশ্চিত হয়েছে। তবে এই মডেল এখন শেষের দিকে এসে ঠেকেছে।
নব্যউদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে বৈষম্য তৈরি করেছে, তা একে স্থবিরতা ও উচ্চ বেকারত্বের মতো সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ কারণেই নিজের দেশের বেকারত্ব কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিতে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করছেন। এ ধরনের শুল্ক হলো ‘প্রতিবেশীকে নিঃস্ব করার’ নীতি, যার মাধ্যমে বেকারত্ব অন্য দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়।
কিন্তু গ্লোবাল সাউথের কোনো দেশ স্বাধীন প্রবৃদ্ধির এমন কৌশল অনুসরণ করলে যুক্তরাষ্ট্রই তার বিরোধিতা করবে।
তাছাড়া, যেকোনো স্বাধীন প্রবৃদ্ধির কৌশল—এমনকি আয়বৈষম্য কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ গ্রহণ করতে গেলেও তলানির দিকে থাকা দেশগুলোর এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যার বিরোধিতা করবে প্রচলিত এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই। এর মধ্যে রয়েছে ধনীদের ওপর কর আরোপ, রাজস্ব ঘাটতি বৃদ্ধি করা অথবা শুল্কের মাধ্যমে নিজের দেশের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়া।
তবে, এক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো—যেহেতু নব্যউদার অর্থব্যবস্থা বৈশ্বিক এবং ইচ্ছামতো যেকোনো দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাই এর নির্দেশনা মেনে চলতে হয়। তা না হলে পুঁজি ও নগদ প্রবাহ ওই দেশ থেকে বেরিয়ে যাবে এবং দেশটিতে সংকট তৈরি হবে।
তাই প্রবৃদ্ধির কৌশল পরিবর্তন করতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে পুঁজির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ, পুঁজির বহির্গমনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে।
তবে এই কৌশলের বড় ঝুঁকি হলো—এতে দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি পুঁজি ও নগদ প্রবাহ কমে যাবে। ফলে লেনদেনের ভারসাম্যের ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজন হবে।
তাই অর্থনৈতিক কৌশল পরিবর্তনে কোনো ক্ষুদ্র বা জোড়াতালি ধরনের পদক্ষেপ দিয়ে কাজ হবে না। বরং, পরিবর্তন চাইলে বড় ধরনের আন্তঃসম্পর্কিত পদক্ষেপের দিকে এগোতে হবে।
এর অর্থ হবে—দিরিজিজম, অর্থাৎ রাষ্ট্রের আরও বেশি হস্তক্ষেপ বাড়ানোর দিকে এগোনো। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি নিজের দেশের ধনী শ্রেণিও এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করবে।
নব্যউদারনীতিবাদ গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে যে জটিল সংকটে ফেলেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে এমন পরিবর্তনই প্রয়োজন। জনগণকে এর পক্ষে সংগঠিত করা গেলেই কেবল তা সম্ভব হবে।
আর সেজন্য জনগণের সামনে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে হতে যাওয়া বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট লাভের প্রতিশ্রুতির স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপন করতে হবে।
ভারতের ক্ষেত্রে, আমি বলে আসছি, নব্যউদারবাদ থেকে সরে আসার সঙ্গে সর্বজনীন, সংবিধানসম্মতভাবে নিশ্চিত এবং আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য মৌলিক অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এমন পাঁচটি অধিকার হলো–
খাদ্যের অধিকার;
কর্মসংস্থানের অধিকার (কর্মসংস্থান দিতে না পারলে পূর্ণ মজুরি দিতে হবে);
জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনামূল্যে, মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অধিকার;
বিনামূল্যে, মানসম্মত, সর্বজনীন ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার অধিকার; ও
সবার জন্য অবদানবিহীন জীবনধারণের উপযোগী পেনশন (যারা অন্য কোনো ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন তারা ছাড়া)
এবং এগুলোর পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ভাতা—যা ভারতের জনসংখ্যার শুধু শীর্ষ ১ শতাংশের ওপর দুটি কর আরোপ করেই দেওয়া সম্ভব। প্রথমত, ২ শতাংশ সম্পদ কর। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত সম্পদের ওপর এক-তৃতীয়াংশ উত্তরাধিকার কর।
আমি নিশ্চিত, সমাজের শুধু শীর্ষ পর্যায়ের ধনীদের ওপর কর আরোপ করে বাংলাদেশেও একই ধরনের অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র সহজেই গড়ে তোলা সম্ভব।
এমন একটি ‘নতুন উদ্যোগ’ জনগণকে অর্থনৈতিক কৌশলে পরিবর্তন আনতে চাওয়া সরকারকে সমর্থন করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
ডেইলি স্টার: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের অধিকাংশজুড়েই রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত যুক্ত। কিন্তু কম খরচের রপ্তানির ওপর নির্ভর করে একটি দেশ কি সত্যিই সমৃদ্ধ হতে পারে? রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি মডেলের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা কী এবং এতে আটকে পড়া এড়াতে বাংলাদেশের এখন কী করা উচিত?
প্রভাত পাটনায়েক: রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলের একটি দিক রয়েছে, যা প্রায়ই যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না। বিশ্বের সব দেশ যদি রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করে, তাহলে এতে সব দেশের সম্মিলিত রপ্তানির প্রবৃদ্ধি তথা বিশ্ববাজারের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ে না।
তাই কিছু দেশের রপ্তানি যদি বিশ্ববাজারের তুলনায় দ্রুত হারে বাড়ে, তাহলে অন্য কিছু দেশের রপ্তানি বৃদ্ধির হার অবশ্যই কম হতে হবে। অন্য কথায়, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশল দেশগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। সহযোগিতার পরিবর্তে এটি তাদের মধ্যে ডারউইনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে, যা আমার কাছে মৌলিকভাবেই নিন্দনীয়।
তবে অভ্যন্তরীণ বাজারভিত্তিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে না।
কিছু পরিসংখ্যান বিবেচনা করা যাক। কোভিড অতিমারি বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দেওয়ারও আগে ২০১০–২০২০ দশকে বৈশ্বিক জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২ দশমিক ৬ শতাংশ।
একই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে এই দুই হারের পার্থক্য তথা বিশ্ব অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে প্রায় ১ শতাংশ।
কিন্তু এসময় বৈশ্বিক শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধির হার ছিল আরও বেশি, প্রায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। তাই গোটা বিশ্বকে বিবেচনায় নিলে, রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশলের অধীনে শুধু শ্রমশক্তিতে নতুন করে যুক্ত হওয়া মানুষদেরই কর্মসংস্থান দেওয়া সম্ভব হবে না। এবং এই পরিসংখ্যানে আগে থেকে উপস্থিত বেকার, অর্ধবেকার ও খণ্ডকালীন শ্রমিকদের কথা না হয় বাদই দিলাম।
যেহেতু দারিদ্র্যের মাত্রার সঙ্গে এই শ্রম মজুতের আকারের সম্পর্ক রয়েছে, তাই রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি কৌশলে বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূর হবে না। বরং এ কৌশল অনুসরণ করতে থাকলে সময়ের সঙ্গে দারিদ্র্য আরও বাড়বে।
অবশ্য রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কৌশলে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ ভালো করতে পারে, কিন্তু তা করতে গিয়ে তাকে অন্য কোনো দেশকে আরও খারাপ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে হবে। তাই দেশগুলোকে রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বড় দেশগুলো তা তুলনামূলক সহজেই করতে পারে, কিন্তু ছোট দেশগুলোকে নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে একত্র হয়ে পর্যাপ্ত আকারের একটি অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করতে হবে, যার ভিত্তিতে তারা প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।
অবশ্য অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর প্রবৃদ্ধির অর্থ শুধু অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নয়; এ ধরনের প্রবৃদ্ধি অনুসরণকারী দেশগুলো নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পরস্পরের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারে, তবে প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে অভ্যন্তরীণ বাজার।
অর্থনীতিবিদ নিকোলাস কালডর একসময় রপ্তানিনির্ভর শিল্পায়নের দুটি ধরনের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন: একটি হলো—যেখানে অন্যান্য দেশে রপ্তানির মাধ্যমে শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটে; আর অন্যটিতে প্রবৃদ্ধি ঘটে কৃষিতে রপ্তানির মাধ্যমে। আমি দ্বিতীয়টির পক্ষে।
ডেইলি স্টার: দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং কৃচ্ছ্রসাধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের চাপে রয়েছে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বারবার কেন এমন পরিস্থিতিতে পড়ে? বাংলাদেশ কীভাবে নিজেদের উন্নয়ন কৌশলে স্বাধীনতা বজায় রেখেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে?
প্রভাত পাটনায়েক: শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশই এসব দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার মুখোমুখি। এর কারণ লুকিয়ে আছে বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থার একটি মৌলিক ত্রুটির মধ্যে।
ধরা যাক, পৃথিবীতে মাত্র দুটি দেশ আছে এবং তারা একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করে। একটি দেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আছে, অর্থাৎ দেশটি যতটা আমদানি করে তার চেয়ে বেশি রপ্তানি করে। অন্য দেশটির ঠিক সমপরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি আছে।
এখন উদ্বৃত্ত দেশটি যদি নিজের দেশের পণ্য ও সেবার ওপর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ায়—যেমন শ্রমিক ও কৃষকদের আয় বাড়িয়ে তাদের বেশি পণ্য ও সেবা কেনার সুযোগ দেয়, তাহলে সেই বাড়তি চাহিদার একটি অংশ ঘাটতি থাকা দেশের পণ্য আমদানির দিকে যাবে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি-উদ্বৃত্তের ভারসাম্য কমে আসবে।
এর ফলে শুধু বাণিজ্যের ভারসাম্যই ফিরবে না; দুই দেশ মিলিয়ে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মানুষের ভোগও বাড়বে। বিশেষ করে ঘাটতি থাকা দেশটি বেশি উপকৃত হবে। অর্থাৎ, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য ঘাটতি থাকা দেশকে শুধু আমদানি কমিয়ে অর্থনীতি সংকুচিত করতে হবে না; বরং উদ্বৃত্ত দেশ নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ালেও একই ভারসাম্য অর্জন করা সম্ভব।
কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থা এই পথ অনুসরণ করে না। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূর করতে উদ্বৃত্ত দেশকে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বাড়িয়ে সমন্বয় করতে বাধ্য করা হয় না; বরং ঘাটতিতে থাকা দেশকেই তার অভ্যন্তরীণ ব্যবহার কমাতে বাধ্য করা হয়।
এতে বিশ্বে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও ভোগ কমে যায় এবং ঘাটতিতে থাকা দেশটির ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হয়। এটি অত্যন্ত অযৌক্তিক একটি ব্যবস্থা।
১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সময় এটি চালু করা হয়েছিল এবং এখনো টিকে আছে, কারণ পুঁজিবাদের অধীনে শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর পরিবর্তে তা কমানোর প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই অযৌক্তিক ব্যবস্থার কারণে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে বাণিজ্যনির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে।
ডেইলি স্টার: খাদ্যের দাম, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আমদানির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা গ্লোবাল সাউথজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আরও সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিপর্যয়গুলো থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
প্রভাত পাটনায়েক: ঔপনিবেশিক সময়ের মতোই এখনো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো মূলত গ্লোবাল নর্থের জন্য প্রাথমিক পণ্য উৎপাদন করে। তবে একটি পার্থক্য রয়েছে—নিজেদের সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলো খাদ্যশস্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের বড় উৎপাদক হয়ে উঠেছে। ফলে এখন দক্ষিণের দেশগুলোর ওপর উত্তর থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করার এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিবর্তে অর্থকরী ফসল ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়ার চাপ রয়েছে।
অন্য কথায়, দক্ষিণের দেশগুলোকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে, যা অনেক আফ্রিকান দেশ ইতোমধ্যেই করেছে। তবে এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা পরিত্যাগের ফলে এ দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। গ্লোবাল নর্থের দেশগুলো যদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তাহলে এসব দেশ দুর্ভিক্ষের মতো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপিত না হলেও অন্য যেকোনো বিপর্যয়ে তারা খাদ্যশস্যের মারাত্মক ঘাটতিতে পড়তে পারে।
খাদ্যশস্যের তুলনায় অর্থকরী ফসলের দাম অনেক বেশি ওঠানামা করে। যে বছর অর্থকরী ফসলের দাম ধসে পড়ে, সে বছর দেশটির খাদ্যশস্যের প্রয়োজন মেটানোর মতো ক্রয়ক্ষমতা থাকে না। আর কোনোভাবে নিজের দেশের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ আমদানি নিশ্চিত করলেও তা ওই দেশের জনগণের কেনার মতো ক্রয়ক্ষমতা থাকবে না।
এর ফলে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকটি দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। যেগুলোকে অধ্যাপক অমিয় কুমার বাগচী যথার্থভাবেই ‘বিশ্বায়নের দুর্ভিক্ষ’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, বিশ্বায়নের ফলে যে উৎপাদন বিশেষায়ন ঘটে, সেগুলো থেকেই এসব দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি।
তাই বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক স্বাধীনতার নয়; দুর্ভিক্ষের মতো বিপর্যয় এড়ানোর প্রয়োজনও এর সঙ্গে জড়িত। আর এ কারণেই গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে।
কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভারত সরকার খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করতে নিজের দেশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা পুরো ব্যবস্থাটিই ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে এ পদক্ষেপের বিরুদ্ধে কৃষকরা প্রায় বছরব্যাপী আন্দোলন চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটে। অন্য কথায়, কৃষকরাই চান তাদের নিজেদের দেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক।
ডেইলি স্টার: অনেকেই মনে করেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তের কাছে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাস্তব অর্থে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য বৃহত্তর অর্থে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বরূপ কেমন হবে?
প্রভাত পাটনায়েক: অর্থনৈতিক স্বাধীনতার মূল অর্থ হলো—একটি দেশের অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারিত হবে তার নিজের জনগণের ইচ্ছায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকে এবং গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে কাউকে বেছে নেওয়ার সময় জনগণ কার্যত বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মসূচিগুলোর মধ্য থেকে একটিকে বেছে নেয়। কিন্তু নব্যউদারবাদ (নিউলিবারেলিজম) পুরো চিত্রটিই বদলে দিয়েছে।
এমন এক বিশ্বে, যেখানে অর্থব্যবস্থা বৈশ্বিক হলেও দেশ এখনো জাতিরাষ্ট্র হিসেবেই রয়েছে—সেখানে জনগণ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার ইচ্ছাই ওই দেশের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করে।
পুঁজি বাইরে চলে যেতে পারে—এই আশঙ্কায় সব রাজনৈতিক দল কমবেশি একই অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা অর্থব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি এই বাধা সত্ত্বেও ভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কোনো দল নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পর, বড় ধরনের পুঁজির বহির্গমনের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ঠেকাতে নিজেদের অবস্থান বা নীতি পরিবর্তন করে।
তাই গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অর্জনের সবচেয়ে মৌলিক শর্ত হলো—অর্থ তথা পুঁজির বহির্গমনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা। আগেই বলা হয়েছে, এই শর্তটিই একটি স্বাধীন উন্নয়ন কৌশলের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করবে।
সংক্ষেপে বললে, এ ধরনের কৌশলের মধ্যে থাকবে অভ্যন্তরীণ বাজারের ওপর নির্ভরতা, যার জন্য কৃষির উন্নয়ন করা; বেসরকারি খাতের ‘বিনিয়োগ অবরোধ’ মোকাবিলায় সরকারি খাতকে শক্তিশালী করা; অধিকারভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিকেন্দ্রীকরণ করা, যাতে এমনকি গ্রাম পর্যায়ের সভায় সরাসরি নিজেদের অর্থনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলে এমন বিষয়ে মানুষ হস্তক্ষেপ করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ডেইলি স্টার: বাণিজ্যের ধরন পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিশ্বায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের মধ্যেই আমরা এক ধরনের গভীর বৈশ্বিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি। আপনি কি মনে করেন, এই সময়টি গ্লোবাল সাউথকে ভিন্ন কোনো উন্নয়নপথ বা কৌশল অনুসরণের সত্যিকারের সুযোগ দিচ্ছে? যদি তাই হয়, তাহলে এই সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর কী করা উচিত?
প্রভাত পাটনায়েক: এটি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক পরিবর্তনের একটি সময়। তবে গ্লোবাল সাউথের ওপর শীর্ষস্থানীয় পুঁজিবাদী দেশ যেসব পরিবর্তন চাপিয়ে দিচ্ছে, তার ফল হলো পুনঃউপনিবেশায়নের দিকে যাওয়া।
এই প্রচেষ্টায় দুটি প্রধান অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রথম অস্ত্রটি হলো—গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর ওপর অসম চুক্তি চাপিয়ে দেওয়া, যার ফলে এসব দেশকে আরও বেশি মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হবে এবং এর মাধ্যমে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যমান বেকারত্ব তাদের অর্থনীতিতে আমদানি করতে হবে।
বর্তমানে আলোচনাধীন ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি এমন একটি উদাহরণ এবং নিঃসন্দেহে গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি করা হবে।
দ্বিতীয় অস্ত্রটি হলো—দক্ষিণের সম্পদ, বিশেষ করে তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
এর অর্থ হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক উপনিবেশমুক্তির পর যে অর্থনৈতিক উপনিবেশমুক্তি ঘটেছিল, তার উল্টো পথে যাওয়া। ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথ তার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছিল।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণের পর দেশটির তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এই পুনঃউপনিবেশায়নের প্রচেষ্টার একটি উদাহরণ। কেননা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় ভেনেজুয়েলায় তেলের মজুত সবচেয়ে বেশি।
আরেকটি উদাহরণ হলো—যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি আগ্রাসনের মাধ্যমে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটিয়ে ইরানের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, যেটি অবশ্যই চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিরল মৃত্তিকাসহ মূল্যবান খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাও একই কৌশলের অংশ।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরিকল্পনা সফল না হওয়া ‘শাসন পরিবর্তন’ প্রচেষ্টার পথে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে—পরিকল্পনাটি বাতিল হয়ে গিয়েছে।
তাই বিকল্প অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করতে বাংলাদেশের মতো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে প্রথমেই এই পুনঃউপনিবেশায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
