রোহিঙ্গাদের জন্য আসা ত্রাণের অর্থ অপব্যবহারের খেসারত

Date:

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটগুলোর একটি। মিয়ানমার থেকে নিপীড়িত হয়ে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে তাদের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সমন্বয় করে সংস্থাটি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়, সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বের অন্যতম অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য এই সহায়তা কার্যক্রমে ইউএনএইচসিআরের অবদান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঠিক এই কারণেই সম্প্রতি নিউ এজ-এ প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট রিপোর্টের পর্যবেক্ষণগুলো গভীর মনোযোগ দাবি করে। জাতিসংঘের সদর দপ্তরের অফিস অব ইন্টারনাল ওভারসাইট সার্ভিসেস (ওআইওএস) ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের ওপর পরিচালিত এই অডিটে বাংলাদেশের ইউএনএইচসিআর পরিচালিত রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পগুলোতে গুরুতর অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও ত্রাণ সহায়তার অপব্যবহারের চিত্র উঠে এসেছে।

অডিট প্রতিবেদনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এখানে তুলে ধরা হলো:

১. ত্রাণসামগ্রী অপচয়: এমন অনেক ত্রাণ সামগ্রী কেনা হয়েছে যেগুলো রোহিঙ্গাদের কোনো প্রয়োজন ছিল না। যেমন: খাওয়ার জন্য চামচ, কাঁটাচামচ ও ছুরি। রোহিঙ্গারা হাত দিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেন। তাই তাদের খাওয়ার জন্য এসব সামগ্রী কেনার কোনো অর্থ হয় না। তাও তাদের জন্য ১ লাখ ৮২ হাজার ডলার মূল্যের চামচ, কাঁটাচামচ ও ছুরি কেনা হয়েছে। এসব নিয়ে বারবার অভিযোগ করার পরও ত্রাণসামগ্রীর ধরন পরিবর্তন করা হয়নি। ফলে ৬২ হাজারের বেশি কুকিং সেট গুদামে পড়ে ছিল, যার মূল্য ১৩ লাখ ২০ হাজার ডলার বা ১৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।

২. হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের নামে অপচয়: ২২ লাখ ডলার বা ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯৯টি হাতি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। পরে মূল্যায়নে দেখা যায়, টাওয়ারগুলো কার্যকর নয়। ৮৩টি টাওয়ারের ছাদ ঘূর্ণিঝড়-উপযোগী না হওয়ায় তা খুলে ফেলতে হয়। এতে ৫৬ হাজার ডলার মূল্যের উপকরণ নষ্ট হয়। টাওয়ারগুলো টেকসই করতে আরও ৩ লাখ ৬৭ ডলার ব্যয় করা হলেও তা কোনো কাজে লাগেনি। ২০২৫ সালের মূল্যায়নে টাওয়ারের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করা হলেও অডিট পর্যন্ত মাত্র ১২টি অপসারণ করা হয়।

৩. অপ্রয়োজনীয় যানবাহন: সরকারি প্রকল্পের মতোই অপ্রয়োজনীয় গাড়ি কেনা হয়েছে। ১৬টি ক্যাম্পের জন্য কেনা ৫২টি গাড়ির কোনো যৌক্তিকতা দেখাতে পারেনি ইউএনইএচসিআর। প্রশাসনিক কাজে ৪৮টি গাড়ি কেনা হয়েছে, যদিও এসব গাড়ির চালক মাত্র ২৯ জন। ১০৪টি গাড়ির মধ্যে ১০টি দীর্ঘদিন অচল ছিল। তারপরেও এসব অচল গাড়ির জন্য ভাড়া বাবদ ৮০ হাজার ডলারের বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।

৪. এলপিজি ক্রয়ে অতিরিক্ত ব্যয়: ২ কোটি ৪২ লাখ ডলার বা ২৯৫ কোটি টাকা মূল্যের এলপিজি রিফিল কেনা হলেও প্রকৃত প্রয়োজন ছিল ১ কোটি ৮৭ লাখ ডলার বা ২২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় ৫৫ লাখ ডলার বা ৬৭ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করা হয়েছে।

৫. নির্মাণ ও কেনাকাটায় অপচয়: কক্সবাজারে ২ লাখ ৪০ হাজার ডলার বা ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন অফিস নির্মাণ করা হয়। কিন্তু জমির মালিকের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি। প্রকল্প চলাকালে নকশা পরিবর্তন করে তৃতীয়তলা যোগ করায় ব্যয় বেড়ে যায়। ভবন নির্মাণ শেষে ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেন জমির মালিক, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ভাড়াচুক্তি ছিল না। নতুন অফিস পাঁচ মাস খালি পড়ে থাকলেও পুরোনো অফিসের জন্য প্রতি মাসে ১১ হাজার ডলার বা ১৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে।

এছাড়া, এমন কতগুলো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে যেগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে উখিয়ায় ১৫ লাখ ডলার (প্রায় ১৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা) ব্যয়ে নির্মিত একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল, ভাসানচরে স্থাপিত ২০ শয্যার হাসপাতাল ও সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতি যার মূল্য ১ লাখ ৪০ হাজার ডলার (প্রায় ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা) এবং ৭৪ হাজার ৩০১ ডলার (প্রায় ৯১ লাখ টাকা) মূল্যের একটি এক্স-রে মেশিন।

৬. ঠিকাদার নির্বাচন ও কেনাকাটায় অনিয়ম: ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ৩০৫ কোটি টাকা মূল্যের নির্মাণকাজ ও কেনাকাটার কাজ একজন ঠিকাদারকেই দেওয়া হয়। এই ঠিকাদার বাজার দরের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি দর নিয়েছে, যার ফলে ক্ষতি হয়েছে ৬৫ লাখ ডলার বা ৭৯ কোটি টাকা। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণেও একজন ঠিকাদারের ওপর নির্ভর করা হয়। যদিও ২০২৪ সালে নির্বাচিত অন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের দর ছিল ৩৩–৪৩ শতাংশ কম।

এলপিজি রিফিল, চুলা, ইগনাইটার, প্রেসার কুকার ও প্রশিক্ষণের জন্য ৩ কোটি ডলার বা ৩৬৬ কোটি টাকা মূল্যের কাজও একজন সরবরাহকারীকে দেওয়া হয়, যদিও তিনি সর্বনিম্ন দরদাতা ছিলেন না। ওই সরবরাহকারী আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ করায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়। চুক্তি অনুযায়ী এলপিজি ডিপোর খরচ ঠিকাদারের বহন করার কথা থাকলেও ইউএনএইচসিআর নিজেই ১৬ লাখ ৬০ হাজার ডলার বা ২০ কোটি টাকা নিজে পরিশোধ করে। প্রেসার কুকারের ওয়ারেন্টির আওতায় স্পার্ক লাইটার পাওয়ার কথা থাকলেও আরও ৬৫ হাজার ডলার বা ৮০ লাখ টাকা মূল্যের লাইটার কেনা হয়।

৭. জ্বালানি ও পরিবেশ প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয়: ৩৯ লাখ ডলার বা ৪৭ কোটি টাকা মূল্যের জ্বালানি ও পরিবেশ কর্মসূচিতে বাজারদরের তুলনায় বেশি দামে কাজ করানো হয়েছে। ২০২১ সালের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঠিকাদারের দর বাজারদর ও অন্যান্য সংস্থার তুলনায় সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ বেশি ছিল। ২০২৩ সালে কোনো যৌক্তিকতা ছাড়াই আরও ১৯–২৫ শতাংশ দর বাড়ানো হয়। এতে ২ লাখ ৯৪ হাজার ডলার বা ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা বাড়তি ব্যয় হয়। বৈদ্যুতিক কাজের জন্য বাজারদরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৫ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন ও বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ করানো হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে স্বার্থের সংঘাতের সৃষ্টি করেছে।

এই অডিটের পর্যবেক্ষণগুলোর গুরুত্ব শুধু হিসাব-নিকাশ বা আর্থিক অনিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

রোহিঙ্গাদের জন্য পরিচালিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এখন তীব্র অর্থসংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে একের পর এক মানবিক সংকট দেখা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক সহায়তা তহবিলের জন্য প্রতিযোগিতা বেড়েছে এবং গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা সংকটে দাতা দেশগুলোর অর্থ সহায়তা কমেছে। এর ফলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য সহায়তা কমিয়ে আনতে হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মুখে পড়েছে, রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে এবং শরণার্থী শিবিরে ন্যূনতম সেবাগুলো চালিয়ে রাখতেও সাহায্য সংস্থাগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি ডলারই অত্যন্ত মূল্যবান। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় মানে এমন অর্থের অপচয়, যা দিয়ে শরণার্থী পরিবারগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আশ্রয় বা সুরক্ষা নিশ্চিত করা যেত। তাই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অপচয় কেবল অদক্ষতার বিষয় নয়; এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে দুনিয়ার সবচেয়ে অসহায় মানুষের জীবনের উপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানবিক সহায়তা মূলত দাতা দেশগুলোর জনগণের আস্থার ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন দেশের সরকার তাদের করদাতাদের অর্থ আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার জন্য বরাদ্দ করে এই বিশ্বাসে যে, সেই অর্থ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে ব্যয় হবে। কিন্তু দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম কিংবা অকার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো অভিযোগ সেই আস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। যদি দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা সংকটে অর্থায়নের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার খেসারত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নয়, প্রথমে দিতে হবে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের। একইসঙ্গে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায় অর্থায়নের ঘাটতি পূরণের অতিরিক্ত চাপ পড়বে বাংলাদেশের ওপরও। অথচ বাংলাদেশ এমনিতেই নিজস্ব অর্থনৈতিক ও রাজস্বসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

ইউএনএইচসিআর অডিটে উত্থাপিত অনেক পর্যবেক্ষণ গ্রহণ করেছে এবং সংশোধনমূলক উদ্যোগ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তবে সেই প্রক্রিয়া অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে। ক্রয় ব্যবস্থা কীভাবে শক্তিশালী করা হচ্ছে, প্রকল্প পরিকল্পনায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং অডিটের সুপারিশগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, এসব বিষয় জনসমক্ষে স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

দিনে দিনে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তার পরিমাণ কমছে। অথচ রোহিঙ্গাদের সংকটের কোনো সমাধান হচ্ছে না, তাদের প্রয়োজনও কমছে না। এরকম একটা অবস্থায় যতটুকু অর্থই পাওয়া যাচ্ছে, তার সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে অপচয়, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার খেসারত কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে না; দিতে হবে সেইসব রোহিঙ্গা পরিবারকে, যাদের বেঁচে থাকা এখনো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

 

কল্লোল মোস্তফা: প্রকৌশলী ও লেখক; তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে কাজ করেন।
[email protected]

Share post:

Popular

More like this
Related

৩০ শতাংশের কম অগ্রগতি হওয়া প্রকল্প বাতিলের নির্দেশ

উন্নয়ন ব্যয়ে অপচয় কমাতে ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় জবাবদিহি বাড়াতে...

এটা আমাদেরই গল্প: ৭ মাসের জার্নি নিয়ে যা বললেন তারকারা

পারিবারিক গল্প নিয়ে নির্মিত ‘এটা আমাদেরই গল্প’ ধারাবাহিক নাটকটি...

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে কতটুকু ছাড় দিতে প্রস্তুত ইরান

একে অপরকে 'শত্রু' হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান...

মেডিকেল কলেজকে নিয়ে অপপ্রচার, আদালতে মামলা

গাজীপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে সামাজিক...