সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেভাবে বদলে দিতে পারে জনপদের অর্থনীতিও

Date:

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ভীমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানা এলাকার ভাসমান পেয়ারা বাজার নিয়ে অসংখ্য সংবাদ পড়েছি। বর্ষা এলেই এই সংক্রান্ত সংবাদ কোনো না কোনো মিডিয়ায় দেখা যায়। অধিকাংশ খবরে থাকে ফলন কেমন হলো, দাম কেমন, কিংবা কৃষকের লোকসান, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, অথবা বিক্রি না হওয়া পেয়ারা খালে ফেলে দেওয়ার কথা।

কিন্তু, সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা ইউএনবিতে নজরে পরে এই ভাসমান বাজারের একটা ভিন্ন গল্প। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় এই ভাসমান পেয়ারা বাজার একটা পর্যটন এলাকায় পরিণত হয়েছে! আর এর ফলে পেয়ারার চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে এবং ওই জনপদের অর্থনীতিকে বেশ শক্তিশালী করেছে।

প্রতিবেদনটা শেষ করেই মনে হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ ব্যবহারকারীদের সত্যনিষ্ঠ, প্রকৃত, যথার্থ ভিডিও কতটা শক্তিশালী হতে পারে! একই মাধ্যম ব্যবহার করে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, তর্ক-বিতর্কের জোয়ার উঠছে। তাহলে প্রকৃত সমস্যাটা কোথায়, মাধ্যমের বৈশিষ্ট্যে, নাকি ব্যবহারকারীর ব্যবহারের ধরনে? এগুলো আমাদের আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজার একটা পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠার পেছনে কোনো প্রথাগত বিজ্ঞাপনের হাত নেই। কেবল রয়েছে কিছু মানুষের প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহার, কিছু ভ্রমণপিপাসু মানুষের অভিজ্ঞতা শেয়ার করা কনটেন্ট। একজন সাধারণ মানুষ সেখানে ভ্রমণে গিয়ে যা দেখেছেন, সেটাই ভিডিওতে ধারণ করেছেন, কিংবা ছবি তুলেছেন, শেয়ার করেছেন বন্ধুদের সঙ্গে। অথবা একজন ইউটিউবার হয়তো নৌকায় বসে ভিডিও করেছেন ভাসমান বাজারের। ফেসবুকে কেউ হয়তো শুধু কয়েকটা ছবি বা ছোট্ট একটা রিল পোস্ট করেছেন। এসব কনটেন্টের মূল বৈশিষ্ট্য একটাই, সেটা হলো বাস্তবতাকে তারা অতিরঞ্জিত করেননি। গ্রামীণ একটা জনপদের নির্দিষ্ট ফসলকে কেন্দ্র করে যে অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, মোবাইলের ক্যামেরায় শুধু সেটুকুই ধারণ করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর সেই সরল উপস্থাপনাটাই মূলত মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছে, নিজ চোখে দেখার আগ্রহ তৈরি রয়েছে অন্যদের মাঝে।

অর্থাৎ একটা ভিডিও বা একটা ছবি শুধুমাত্র প্ল্যাটফর্মেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং একটা মানুষের ভ্রমণ গন্তব্য নির্ধারণের কারণ হয়েছে। তার তাতেই বদলে গেছে প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো এক ভাসমান বাজারকেন্দ্রিক পিরোজপুরের ভীমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানা এলাকার অর্থনীতি।

সাধারণ মানুষের তৈরি করা কনটেন্টের কারণে সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশের এ ধরনের আরও অসংখ্য স্থান আছে। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা গ্রামে শাপলা বিল কিংবা সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও গ্রামে জাদুকাটা নদীর তীরের শিমুল বাগান—এই জায়গাগুলো একটা সময় শুধুই স্থানীয়দের কাছেই পরিচিত ছিল। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণপিপাসুদের ছবি, ভিডিও ও অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ার পরই সারা দেশে পরিচিতি পায়।

কোথাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তো কোথাও কৃষকের বিস্তৃত খেতে ফুটে থাকা রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, এমনকি সরিষা বা সূর্যমুখী ফুল মানুষকে আকর্ষণ করছে। একেক মৌসুমে কৃষিজমিও পরিণত হচ্ছে পর্যটনের অংশে।

এখন মানুষ মৌসুম ভেদে এসব জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। যে মৌসুমে যে জায়গাটা আরও বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে, সেই মৌসুমে সেখানেই মানুষের যাত্রা। গৎবাঁধা ভ্রমণ গন্তব্যের বদলে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সৌন্দর্যসুধা পান করতে সবাই বেড়িয়ে পরেন।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডেনিস ম্যাককুয়েল তার ‘ম্যাস কমিউনিকেশন থিওরি: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন’ গ্রন্থে মিডিয়াকে একটা জানালার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এটা ঘটনা এবং অভিজ্ঞতার এমন একটা জানালা যা আমাদের দৃষ্টিসীমাকে বিস্তৃত করে এবং অন্যের হস্তক্ষেপ ছাড়াই আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, তা নিজের চোখে দেখার সুযোগ দেয়।

অনেকটা সময় ধরে এই জানালার নিয়ন্ত্রণ ছিল শুধুমাত্র মূলধারার গণমাধ্যমের হাতে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবির্ভাবে এই ক্ষমতা এখন প্রতিটা মানুষের হাতেই চলে এসেছে। মিডিয়া গবেষক হেনরি জেনকিন্স তার ‘কনভার্জেন্স কালচার: হোয়্যার ওল্ড অ্যান্ড নিউ মিডিয়া কোলাইড’ গ্রন্থে এটাকেই বলেছেন ‘অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি’।

পিরোজপুরের ভাসমান পেয়ারা বাজারের ক্ষেত্রে হয়েছে তাই। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যও লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত: যেকোনো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এখন অনেক সহজ। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু ইন্টারনেট সংযোগ আর স্মার্টফোন থাকলেই যে কেউ নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারেন। দ্বিতীয়ত: প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেওয়ার অপেক্ষা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট বা শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন। আর সেই ভিডিওই অন্যদের জন্য অনানুষ্ঠানিক পথনির্দেশনায় পরিণত হচ্ছে। কোথায় যেতে হবে, কীভাবে যেতে হবে, কোন মৌসুমে গেলে সবচেয়ে ভালো অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে প্রভৃতি তথ্যগুলো পোস্ট করা কনটেন্ট থেকেই পেয়ে যাচ্ছেন। আর তৃতীয়ত: একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর ছোট্ট একটি কনটেন্টে বদলে যেতে পারো একটি এলাকার অর্থনীতি—সেটাও হয়তো তার অজান্তেই।

আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডেই নিজের চেহারা বদলে ফেলা যায়, গাছের রং, আকাশের রং, মাঠের রং বদলে ফেলা যায়! এমন দৃশ্যও তৈরি করা যায়, যা বাস্তবে কখনো ছিলই না। কৃত্রিমভাবে তৈরি করা এমন দৃশ্য হয়তো কিছুক্ষণের জন্য বিস্ময় তৈরি করে, ব্যক্তিগতভাবে আমাদেরকে ক্ষণিকের আনন্দও দেয়; কিন্তু একটি বাস্তবতা-নির্ভর চিত্র বা ভিডিও মানুষকে নতুন বার্তা দেয়, ভাবায়, ভ্রমণে আগ্রহী করে তোলে। আর তাইতো সেগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি।

সবমিলিয়ে একটা বার্তা স্পষ্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যথেষ্ট শক্তিশালী। এটাকে ব্যবহার করে দেশ ও মানুষের উপকার করব, নাকি বিদ্বেষ ছড়াবো, সেটা নির্ভর করছে আমাদের ওপরই।

 

জান্নাতুল রুহী: সাংবাদিক ও লেখক।

Share post:

Popular

More like this
Related

শীর্ষস্থানীয় উৎপাদক হয়েও কেন মাছ আমদানি করে বাংলাদেশ?

বিশ্বের অন্যতম প্রধান মাছ উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। খাদ্য ও...

‘পর্দার মায়ার সঙ্গে বাস্তবের মিমের মিল নেই’

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম। হুমায়ূন আহমেদ...

নথি ফাঁস, গাজায় সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের যে পরিকল্পনা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন

গাজায় প্রায় ৫ হাজার সেনার জন্য একটি সামরিক ঘাঁটি...

বন্ডাই সৈকতে বন্দুক হামলা: অ্যাশেজেও শোকের ছায়া

সিডনির বন্ডাই সৈকতে গত রোববার বন্দুকধারীদের গুলিতে হতাহতদের স্মরণ...