সুজন মিয়ার ‘ভার’ এবং আমাদের হৃদয়ের ক্যামেরা বন্ধ করে ফোনের ক্যামেরা অন

Date:

ঈদ মানে সাধারণভাবে নতুন পোশাক, ভালো খাবার, বাড়ি ফেরার আনন্দ, পরিবার-স্বজনদের সঙ্গে কিছু সুন্দর সময়। আর বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঈদ হলো আর্থ-সামাজিক যাঁতাকলে টিকে থাকার তীব্র লড়াইয়ের মাঝে নির্মল শান্তির একটু মুহূর্ত তৈরির চেষ্টা। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে একটি দিন পার করা।

নরসিংদীর শিবপুরের সুজন মিয়া ও সাথী বেগমের পরিবারের ঈদের প্রস্তুতিও ছিল প্রায় শেষ দিকে। দুই সন্তানসহ জেলা শহরে এসে ঈদের কেনাকাটা শেষে এবার ঘরে ফেরার পালা। ঈদের আগের রাত প্রায় ৮টার দিকে নরসিংদী রেলস্টেশনে পৌঁছালেন তারা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা, যা আবারও মনে করিয়ে দিলো জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলো কোনো পূর্বাভাস দিয়ে আসে না।

রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে সাথী ও তাদের দুই বছরের ছেলে হাছেন। জীবনের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই খানখান হয়ে ভেঙে পড়ে পেশায় দিনমজুর কিংবা রিকশাচালক সুজন মিয়ার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যায় ওই ঘটনার বেশ কিছু ছবি-ভিডিও। মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ছবি-ভিডিও অসংখ্য মানুষকে নাড়া দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেনে কাটা পড়া স্ত্রীর মরদেহ এক কাঁধে তুলে নিলেন সুজন, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন তার কোলে তুলে দিলেন নিথর হাছেনকে। আর নিচে পড়ে থাকা সদ্য কেনা ঈদের পোশাক কেউ একজন যেন তার হাতে ধরিয়ে দিলো। আর এ অবস্থাতেই সুজন ছুটে চলেন হাসপাতালের উদ্দেশে।

ছবিটি দেখে প্রথম যে অনুভূতি আসে, তা হলো গভীর বেদনা। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে—স্টেশনজুড়ে এই পরিবারটির চারপাশে এত লোক ছিল, তারপরও কেন এই বিপর্যস্ত মানুষটিকে একাই এই অসহনীয় ভার বহন করতে হলো?

ছবিতে দেখা যায়, চারপাশে মানুষের অভাব নেই। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ তাকিয়ে আছেন, কেউ মোবাইল ফোন হাতে দৃশ্যটি ধারণ করছেন। একজন বিপর্যস্ত মানুষ নিজের কাঁধে স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ বহন করছেন, আর আশপাশের বহু মানুষ সেই দৃশ্যের দর্শকে পরিণত হয়েছেন। এই দৃশ্যটি হয়তো দুর্ঘটনার চেয়েও বেশি ভয়ংকর।

হঠাৎ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে আমাদের ফোনের ক্যামেরা যেভাবে অন হয়ে যায়, হৃদয়ের ক্যামেরা সেভাবে হয়তো অন হওয়া ভুলে গেছে। দুর্ঘটনা হঠাৎ ঘটলেও মানুষের ভেতরের মানবিকতার ক্ষয় একদিনে ঘটে না। এটি ধীরে ধীরে জন্ম নেয়, যখন আমরা অন্যের কষ্টকে অনুভব করার বদলে সেটিকে শুধুই একটি ঘটনা হিসেবে দেখতে শুরু করি।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে অনেকের কাছে কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় সাহায্যের হাত বাড়ানো নয়, বরং মোবাইল ফোন বের করা। কেউ আহত হলে ভিডিও, কেউ কাঁদলে ভিডিও, কেউ বিপদে পড়লে ভিডিও। যেন মানুষের জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও বেদনাদায়ক মুহূর্তও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টে পরিণত হয়েছে।

অবশ্যই সংবাদ ও তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু একজন ভেঙে পড়া মানুষকে সাহায্য করার আগে ভিডিও ধারণ করার প্রয়োজন কতটা? একজন বাবার কাঁধের ভার কি কয়েকজন মিলে ভাগ করে নেওয়া যেত না? কান্নারত শিশুটিকে কেউ কি কোলে নিতে পারত না? অন্তত কয়েক কদম পথ কি কেউ তার পাশে হাঁটতে পারত না?

প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অনুভূতিহীনও করে তুলেছে। আমরা ঘটনার সাক্ষী হচ্ছি, কিন্তু অংশগ্রহণকারী হচ্ছি না। আমরা দেখছি, কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছি না। আমরা ধারণ করছি, কিন্তু সহমর্মিতা দেখাচ্ছি না।

নরসিংদীর এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোক নয়। এটি আমাদের সমাজের জন্যও একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একজন মানুষ কতটা একা হয়ে যেতে পারে।

কিছুদিন পর এই ছবি হয়তো টাইমলাইন থেকে হারিয়ে যাবে। নতুন খবর আসবে, নতুন আলোচনায় মানুষ ব্যস্ত হবে। কিন্তু সেই বাবার জন্য এই রাত কোনোদিন শেষ হবে না। তাঁর কাঁধ থেকে হয়তো স্ত্রীর মরদেহ নেমে গেছে, বুক থেকে সন্তানের নিথর দেহও সরেছে, কিন্তু সেই ভার তিনি বয়ে বেড়াবেন সারাজীবন।

প্রশ্ন হলো, আমরা কী মনে রাখব? দুর্ঘটনাটি, নাকি সেই মানুষটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য দর্শককে?

একটি সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার উঁচু সেতু, বড় রাস্তা বা আধুনিক প্রযুক্তিতে নয়। তার পরিচয় নির্ধারিত হয় এই প্রশ্নে—বিপদের মুহূর্তে মানুষ কি মানুষের পাশে দাঁড়ায়?

এই ছবি-ভিডিওগুলো সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে রেখে গেছে।

মো. আব্বাস: দ্য ডেইলি স্টারের সাবেক সংবাদকর্মী। বর্তমানে কাজ করছেন করপোরেট কমিউনিকেশনে।

ইমেল: [email protected]

Share post:

Popular

More like this
Related

আজ রাতে ঈদের বর্ণাঢ্য ‘ইত্যাদি’

প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ আনন্দের সঙ্গে দর্শকদের জন্য বাড়তি...

কখনো কিছু চাইনি, আর কখনো কিছু পাইনি: দাভোসে ট্রাম্প

গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের দাভোসে পৌঁছে...

শীর্ষস্থান হারিয়ে রেফারির সিদ্ধান্তে ক্ষোভ ঝাড়লেন রিয়াল কোচ

জিরোনার মাঠে রিয়াল মাদ্রিদ অমূল্য দুই পয়েন্ট হারানোয় লা...

গাজীপুরে পেট্রোল বোমাসহ গ্রেপ্তার ২

গাজীপুরের টঙ্গী মন্নু টেক্সটাইল মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশের এম.টি...