সবচেয়ে শক্তিশালী পাসপোর্ট সিঙ্গাপুরের, দুর্বল আফগানিস্তানের

Date:

এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণে কম বিধিনিষেধ ও সীমান্তে স্বল্প অপেক্ষার সুবিধা পেতে কিছু দেশের পাসপোর্ট অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী। এমন পাসপোর্টের একটি ‘এলিট’ তালিকা প্রকাশ করেছে হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্স।

সূচকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ তিনটি পাসপোর্টই এশিয়ার দেশগুলোর। এক নম্বরে রয়েছে সিঙ্গাপুর, আর যৌথভাবে দুই নম্বরে রয়েছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।

সূচক অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা বিশ্বের ২২৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১৯২টিতে ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারেন। 

সিএনএন বলছে, লন্ডনভিত্তিক বৈশ্বিক নাগরিকত্ব ও আবাসন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স এই সূচক তৈরি করে, যেখানে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) একচেটিয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়।

সূচকে বলা হয়েছে, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকরা ভিসামুক্তভাবে ১৮৮টি গন্তব্যে যেতে পারেন।

হেনলি সূচকে একই স্কোর পাওয়া একাধিক দেশকে একই অবস্থানে রাখা হয়। সে অনুযায়ী, পাঁচটি ইউরোপীয় দেশ যৌথভাবে তিন নম্বরে রয়েছে—ডেনমার্ক, লুক্সেমবার্গ, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। এসব দেশের নাগরিকরা ১৮৬টি দেশ ও অঞ্চলে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার পান।

চার নম্বর অবস্থানেও পুরোপুরি ইউরোপীয় দেশগুলোর আধিপত্য। ১৮৫ স্কোর নিয়ে এই অবস্থানে রয়েছে—অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস ও নরওয়ে।

পঞ্চম স্থানে রয়েছে হাঙ্গেরি, পর্তুগাল, স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। এসব দেশের স্কোর ১৮৪।

হেনলি পাসপোর্ট ইনডেক্সের ২০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী অগ্রগতি দেখিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০০৬ সালের পর থেকে দেশটি ১৪৯টি নতুন ভিসামুক্ত গন্তব্য যুক্ত করেছে এবং র‌্যাংকিংয়ে ৫৭ ধাপ এগিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব আমিরাতের এই অগ্রগতি এসেছে ‘দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক তৎপরতা ও ভিসা উদারীকরণ নীতির’ ফলে।

ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, এস্তোনিয়া, মাল্টা, নিউজিল্যান্ড ও পোল্যান্ড। সর্বশেষ ত্রৈমাসিক হালনাগাদে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, লাটভিয়া, লিশটেনস্টাইন ও যুক্তরাজ্য।

তবে সূচকে বছরে সবচেয়ে বেশি পতনের শিকার দেশ যুক্তরাজ্য। বর্তমানে দেশটির নাগরিকরা ১৮২টি গন্তব্যে ভিসামুক্ত প্রবেশ করতে পারেন, যা এক বছর আগের তুলনায় আটটি কম।

অষ্টম স্থানে রয়েছে কানাডা, আইসল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়া (১৮১টি গন্তব্য)। নবম স্থানে মালয়েশিয়া (১৮০টি গন্তব্য) এবং দশম স্থানে যুক্তরাষ্ট্র (১৭৯টি গন্তব্য)।

২০২৫ সালের শেষদিকে প্রথমবারের মতো শীর্ষ দশের বাইরে চলে যাওয়ার পর আবার দশম স্থানে ফিরেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে উদযাপনের সুযোগ কম—কারণ গত এক বছরে দেশটি সাতটি ভিসামুক্ত গন্তব্য হারিয়েছে। 

গত দুই দশকে র‌্যাংকিংয়ে পতনের দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় স্থানে রয়েছে; ভেনেজুয়েলা ও ভানুয়াতুর পরেই এর অবস্থান। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র চতুর্থ স্থান থেকে নেমে দশম স্থানে এসেছে।

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের প্রতিবেদনে ভিয়েনাভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান সায়েন্সেসের রেক্টর ও সাংবাদিক মিশা গ্লেনি বলেন, ‘পাসপোর্টের শক্তি মূলত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন প্রভাবিত করার সক্ষমতার প্রতিফলন।’

তিনি বলেন, ‘ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশের নাগরিকদের চলাচল-সুবিধা কমে যাওয়াটা কেবল প্রযুক্তিগত ব্যতিক্রম নয়; বরং এটি গভীর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত।’

সূচকের একেবারে নিচে মাত্র ২৪টি গন্তব্যে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে ১০১ নম্বরে রয়েছে আফগানিস্তান। ১০০ নম্বরে সিরিয়া (২৬টি গন্তব্য) এবং ৯৯ নম্বরে ইরাক (২৯টি গন্তব্য)।

এর ফলে শীর্ষ ও তলানির পাসপোর্টের মধ্যে ভিসামুক্ত গন্তব্যের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ১৬৮টি।

সর্বশেষ সূচকে ৫ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৫ নম্বরে। মাত্র ৩৭টি গন্তব্যে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে বাংলাদেশিদের। এর আগের সূচকে ১০০ নম্বরে ছিল বাংলাদেশ।

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের চেয়ারম্যান ও সূচকের প্রণেতা ক্রিশ্চিয়ান এইচ কেলিন বলেন, ‘গত ২০ বছরে বৈশ্বিক চলাচল অনেক বেড়েছে, কিন্তু এর সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি।’

‘আজকাল পাসপোর্টের সুবিধা সুযোগ, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। গড় প্রবেশাধিকার বাড়লেও বাস্তবতা হলো—চলাচলের সুবিধা ক্রমেই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশগুলোর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে’ বলেন তিনি।

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধনী ব্যক্তিদের দ্বৈত নাগরিকত্ব পেতে সহায়তা করে। প্রতিষ্ঠানটি সিএনএনকে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তারা ৯১টি দেশের নাগরিকদের সহায়তা করেছে, যার মধ্যে মার্কিন নাগরিকরাই ছিল শীর্ষে—মোট ব্যবসার ৩০ শতাংশ।

তবে ইউরোপের কয়েকটি দেশ সম্প্রতি বংশগত নাগরিকত্ব ও তথাকথিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কর্মসূচির শর্ত কঠোর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ওহাইওর রিপাবলিকান সিনেটর বার্নি মোরেনো ‘এক্সক্লুসিভ সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’ প্রস্তাব করেছেন, যার মাধ্যমে মার্কিন নাগরিকদের অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব রাখা নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

হেনলি সূচক ছাড়াও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন পাসপোর্ট সূচক প্রকাশ করে। এর মধ্যে আর্টন ক্যাপিটালের পাসপোর্ট ইনডেক্স জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ও ছয়টি অঞ্চলের পাসপোর্ট বিবেচনায় নেয়। এটি সারা বছর রিয়েল-টাইমে হালনাগাদ হয়।

আর্টনের গ্লোবাল পাসপোর্ট পাওয়ার র‌্যাংক ২০২৬ অনুযায়ী, ১৭৯ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে সিঙ্গাপুর ও স্পেন (১৭৫)।

Share post:

Popular

More like this
Related

ঈদের সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে যা বললেন ৫ তারকা

তানিম নূর গত ঈদে ‘উৎসব’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করে হইচই...

সতীর্থকে চড় মেরে লাল কার্ড!

ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের মাঝে প্রায়ই বাক বিতণ্ডা, হাতাহাতি প্রায়...

একই দিনে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়নি: জামায়াত

'বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে খুবই পরিষ্কার করে বলতে...

শিক্ষার্থীদের জন্য টিকটকের নতুন ফিচার ‘ক্যাম্পাস হাব’

টিকটক নতুন একটি ফিচার চালু করছে, যার নাম ‘ক্যাম্পাস...