ঢাকার জলাবদ্ধতা: প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিতে পারে পরিস্থিতি

Date:

প্রতি বছর বর্ষা এলে ঢাকা শহরটা বিশাল নদীতে পরিণত হয়। রাস্তায় হাঁটু পানি, আর আমাদের একই প্রশ্ন—এই শহরটা কি কোনোদিন ঠিক হবে না? উত্তরটা মন খারাপ করালেও বলা উচিত—এই সিস্টেম ঠিক করার প্রযুক্তি আমাদের হাতের কাছেই আছে। শুধু ব্যবহার করার ইচ্ছেটা নেই। আমরা বাংলাদেশিরা সব বুঝি, শুধু প্রযুক্তি বুঝি না। কারণ, আমরা ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞান ও অংকে দুর্বল। হয়তো আমাদের দুর্বল করে রাখা হয়েছে।

ঢাকার আসল সমস্যা হলো, এই শহরের কোনো ঠিকঠাক মাস্টার প্ল্যান কখনো ছিল না। যেখানে জায়গা পেয়েছে, সেখানেই বাড়ি উঠেছে। যে খাল দিয়ে পানি নামার কথা, সেই খাল ভরাট করে ভবন উঠে গেছে। এখন প্রকৌশলীরা অনুমান করে পাইপ বসান, কারণ মাটির নিচে আসলে কী আছে, কেউ জানে না। এই জায়গাতেই এআই কাজে লাগতে পারে—অনুমান নয়, ডেটা দিয়ে সমাধান।

ধরুন, একটা ‘ডিজিটাল টুইন’—পুরো ঢাকা শহরের একটা ভার্চুয়াল কপি, স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন স্ক্যান আর এলিভেশন ম্যাপ দিয়ে বানানো। এই ডিজিটাল মডেলের ভেতর ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি ফেলে দিলে এআই বলে দিতে পারবে, কোথায় পানি জমবে, কতটা জোরে গড়াবে, আর কোথায় কত ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ লাগবে যাতে জলাবদ্ধতা না হয়। এটা অনেকটা গাড়ি চালানোর আগে জিপিএস দেখে নেওয়ার মতো। আগে থেকে জানলে বিপদ এড়ানো সহজ হয়।

দ্বিতীয় সমস্যাটা আরও পুরোনো ও কষ্টের। ঢাকায় গত কয়েক দশকে ৫০টারও বেশি খাল হারিয়ে গেছে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের হাতে ভরাট হয়ে। কাগজের পুরোনো ম্যাপ ঘেঁটে এই খালগুলো খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব যেন। কিন্তু কম্পিউটার ভিশন অ্যালগরিদম গত ৩০ বছরের স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে কয়েক ঘণ্টায় দেখিয়ে দিতে পারে আসল খালগুলো কোথায় ছিল। এতে সরকারের হাতে একটা স্পষ্ট, তর্কাতীত প্রমাণ থাকবে যে কোন স্থাপনা ভেঙে পানির পথ ফিরিয়ে দিতে হবে।

তৃতীয়টা হলো ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা। ঢাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক আর বস্তি এলাকা এমনভাবে মিশে আছে যে, মাটির পানি শোষণের কোনো জায়গাই বাকি নেই। জেনারেটিভ এআই সফটওয়্যারে শহরের ঘনত্ব আর জমির তথ্য দিলে সেটা বলে দিতে পারে, কোথায় ছাদ-বাগান, কোথায় সবুজ জায়গা, আর কোথায় পানি চুইয়ে যাওয়ার মতো রাস্তা বানাতে হবে।

চতুর্থ ব্যাপারটা হলো, যা আছে তা দিয়েই স্মার্ট হওয়া। রাতারাতি ঢাকার সব পাইপ পাল্টানো সম্ভব না। কিন্তু স্লুইস গেট আর পাম্পে আইওটি সেন্সর বসিয়ে দিলে একটা সেন্ট্রাল ড্যাশবোর্ড থেকে পুরো সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ধানমন্ডিতে পানি জমছে দেখলে, বুড়িগঙ্গার দিকে ড্রেন খালি আছে বুঝে এআই নিজেই নির্দিষ্ট পাম্প চালু করে দিতে পারে। রাস্তায় পানি ওঠার আগেই সমাধান।

এই কাজ যে কল্পনা না, তার প্রমাণ আছে বাইরের দুনিয়ায়। আরেকটা ডুবতে থাকা মেগাসিটি জাকার্তা তাদের জাকি প্ল্যাটফর্মে এআই আর আইওটি বসিয়ে নদীর পানির লেভেল রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করে, আর ভারী বৃষ্টির ৬ ঘণ্টা আগেই পাম্প আর গেট চালু করে দেয়। উহান শহর জিওএআই দিয়ে তাদের কংক্রিটের শহরকে স্পঞ্জ সিটিতে বদলে ফেলেছে। শতকরা ৭০ ভাগ বৃষ্টির পানি এখন মাটি নিজেই শুষে নেয়।

তাহলে ঢাকা কেন পারছে না? উত্তরটা প্রযুক্তির অভাব নয়। উত্তরটা হলো, আমাদের ডেটা এলোমেলো, ছড়ানো-ছিটানো। ওয়াসা এক জায়গায় তথ্য রাখে, সিটি করপোরেশন আরেক জায়গায়, রাজউকের হাতে জমির ম্যাপ এবং কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না। যতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো একটা কমন সিস্টেমে ডেটা শেয়ার না করবে, ততদিন এআই যতই শক্তিশালীই হোক, তার হাত-পা বাঁধা থাকবে। সরকারের হয়ে একবার কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি এটা নিয়ে ড্রাইভ দিয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে বুঝে গেছি এটার জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। উপর থেকে ‘ওহি’ নাযিল না হলে কাজ হয় না।

জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটা, মোবাইল অপারেটরের সিডিআর, আর ট্যাক্স অথরিটির তথ্য যেভাবে এক জায়গায় এলে নাগরিক সেবা বদলে যেতে পারে, ঠিক সেভাবেই ওয়াসা-রাজউক-সিটি করপোরেশনের ডেটা এক প্ল্যাটফর্মে এলে ঢাকার জলাবদ্ধতাও বদলে যেতে পারে। প্রযুক্তি আমাদের হাতে আছে। শুধু একসঙ্গে বসে কাজ করার সাহসটা লাগবে।

রকিবুল হাসান: টেলিকম, অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় মানবিক রাষ্ট্র’ বইয়ের লেখক

Share post:

Popular

More like this
Related

সমালোচনার মুখে এআই ছবি তৈরির ফিচার বন্ধ করল মেটা

সম্প্রতি ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা এআইর মাধ্যমে ছবি তৈরির...

কলকাতায় চঞ্চল চৌধুরীর ২ সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায়

দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতীয় বাংলা সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত...

এবার কানাডাকে ‘ভাঙতে’ চায় যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন সেনারা প্রথমে বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে হামলা চালাবে। কৌশলগতভাবে...

অ্যাশেজ থেকে ছিটকে গেলেন মার্ক উড

বাকি অ্যাশেজ সিরিজ থেকে ছিটকে পড়তে হলো ইংল্যান্ড পেসার...