সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে প্রশিক্ষণ দেবে সরকার। এ লক্ষ্যে তদারকি জোরদার করতে দেশের ১০ লাখ ১৩ হাজার খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, দেশে খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কোনো জাতীয় তালিকা না থাকায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, উদ্যোগের লক্ষ্য হলো—দেশের সব সক্রিয় খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) সঙ্গে তাদের একটি চুক্তি সই করেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, সারাদেশের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য আইআইএফসি তথ্যসংগ্রাহক নিয়োগ করবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যেই এই কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পরে সংশ্লিষ্ট জেলার নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা তথ্য যাচাই করবেন। যাচাই শেষে বিএফএসএর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং প্রকল্পের আওতায় সেগুলো কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হবে।
আনোয়ারুল বলেন, এই তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে খাদ্য উৎপাদন ও ব্যবসা আরও কার্যকরভাবে তদারকি করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। প্রায় এক মাস আগে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকেরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকের নাম, ট্রেড লাইসেন্সের অবস্থা, ব্যবসার ধরনসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন। পরে এসব তথ্য আমদানি, রপ্তানি, উৎপাদনসহ ৩২টি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করে সংরক্ষণ করা হবে। এতে দুধ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য এবং সুপারশপ, মুদি দোকানসহ নানা ধরনের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের তথ্যও থাকবে।
১০ লাখের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তদারকির জন্য নিরাপদ খাদ্যের বর্তমান জনবল যথেষ্ট কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ারুল বলেন, এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও তথ্যভাণ্ডার ও সফটওয়্যার তৈরি সেই সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রথম ধাপ।
তিনি বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তদারকি করা কঠিন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জনবলও বাড়বে বলে আশা করছি।’
রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছেই যখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে, তখন আলাদা করে আরেকটি তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজন হবে কেন।
তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও শ্রম অধিদপ্তর এতদিন কাজ করেছে। কিন্তু আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সেবা।’
ইমরান হাসান বিদ্যমান তথ্যভাণ্ডারের অসঙ্গতির কথা তুলে ধরে বলেন, সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় জানানো হয়েছিল, যেখানে ৬ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হতে ৩৫ বছর লেগেছে, সেখানে মাত্র চার মাসে আরও এক লাখ ৬৬ হাজার নতুন নিবন্ধন হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না করে নতুন প্রকল্প নিলে তা শুধু দাতা সংস্থার অর্থ ব্যয়ের পথ তৈরি করবে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের সমস্যার সমাধান করবে না।
দেশের ৪ লাখ ৮২ হাজার রেস্তোরাঁর তথ্যভাণ্ডার উন্নত করে সেটিকে ভ্যাট, টিআইএন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করার মাধ্যমে ধাপে ধাপে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আহ্বানও জানান তিনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ‘বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বারবার উদ্যোগ সত্ত্বেও এই খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো এখনো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।’
তিনি বলেন, উদ্যোগটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি হবে এবং তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ার মাধ্যমে ভোক্তারা উপকৃত হবেন।