আস্থা গড়ছেন প্রধানমন্ত্রী, ক্ষয় করছে বিএনপি

Date:

এটা ঠিক যে, সরকার বা ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক মূল্যায়ন করার মতো যথেষ্ট সময় এখনো পেরোয়নি। কিন্তু, দলটি কোন দিকে এগোচ্ছে, তা নিয়ে তথ্যভিত্তিক পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য এই সময়টা কমও নয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সঠিক বার্তাই দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু দলের কিছু প্রাথমিক লক্ষণ উদ্বেগজনক। তার মধ্যে রয়েছে বিরোধীদলের সঙ্গে আচরণ এবং বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি। কিছু ক্ষেত্রে এর সুযোগ নিচ্ছেন নেতা ও মন্ত্রীদের পরিবারের সদস্যরা।

প্রথমেই যে প্রশ্নটি করা দরকার সেটা হলো, সরকার কি জনগণের কথা শুনছে? এর উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে, সরকারের ও ক্ষমতাসীন দলের এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা আছে কি না, যার মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত মতামত তাদের কাছে, বিশেষ করে ক্ষমতার কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সরকারি কিংবা দলীয় কোনোপক্ষই কখনো এই কাজটি করেনি। কারণ, তারা অপ্রীতিকর কোনো খবরই উপরমহলে পৌঁছে দিত না। তারা এমন কিছুই বলত না, যার কারণে ‘বস’ অসন্তুষ্ট হতে পারেন। সেই সংস্কৃতির কি পরিবর্তন হয়েছে? আমরা আশা করি হয়েছে। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতি যে ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা যেন ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছে।

গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া গণমাধ্যমগুলো রাজনৈতিক বিভাজনে বিভক্ত। এটা গণমাধ্যমের জন্য যেমন স্বাস্থ্যকর না, তেমনি ক্ষমতাসীনদের জন্যও সহায়ক না। এখন পর্যন্ত বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে চলেছে, এ জন্য আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই।

সম্প্রতি বিএনপি ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে। এ উপলক্ষে দলটির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তারা ‘জবাবদিহিমূলক শাসনের মাধ্যমে জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান’ দিতে চান। তিনি যদি এই একটি কাজ পরিপূর্ণভাবে করতে পারেন, তাহলে জনগণ সবসময় তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।

কিন্তু একটি ‘জবাবদিহিমূলক’ সরকারের প্রাথমিক লক্ষণ কী? মানুষ প্রথম যে ধাক্কাটি খেয়েছে তা হলো, সরকার ও প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় লোক বসানোর প্রবণতা। অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্বহাল করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি দলীয় অনুগতদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, অভিজ্ঞতা ও সততা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে—বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। জনগণ ও সরকারকে সেবা দেওয়ার জন্য তারাই কেবল সবচেয়ে ভালো হতে পারে, বিষয়টি এমনও নয়। বরং তারা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত এবং শেখ হাসিনার আমলেও বিএনপির প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেছেন বলে পুরস্কৃত করতেই তাদের কোনো না কোনো পদে বসানো হয়েছে।

নির্বাচন সামনে রেখে সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রশাসক হিসেবেও বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্তদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে বিরোধীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে জামায়াত নেতারা দাবি তুলেছেন, স্থানীয় সরকারের সব স্তর থেকে যেন দ্রুত দলীয় প্রশাসক প্রত্যাহার করা হয় এবং নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের যেন আসন্ন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

বিরোধীদের এই দাবি সহজেই উড়িয়ে দেওয়া যেত, যদি এর ভিত্তি দুর্বল হতো। অধিকাংশ পর্যায়ে, বিশেষ করে নিচের স্তরগুলোতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যা শাসনব্যবস্থাকে জবাবদিহিমূলক হওয়ার থেকে বিরত রাখছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর উপেক্ষা করা উচিত নয়।

জবাবদিহিমূলক শাসনের প্রশ্নে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা প্রয়োজন। সেটি হলো, মন্ত্রণালয়গুলোর দায়িত্ব বণ্টন কীভাবে করা হয়েছে? মন্ত্রণালয় বণ্টনের সময় মন্ত্রীদের দক্ষতা কি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে? আমরা আগেও বলেছি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সবসময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা আশা করা না গেলেও অন্তত সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে তাদের বিস্তারিতভাবে অবহিত করা উচিত। এক্ষেত্রে তাদের জন্য ‘প্রশিক্ষণ’ শব্দটি হয়তো যথোপযুক্ত হবে না, কিন্তু তারা যে চ্যালেঞ্জ ও দায়িত্বের ভার পেয়েছেন সেটা যেন পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বিষয়টি মোটেই হালকাভাবে নেওয়ার মতো বিষয় না। কারণ, আজকের দিনে রাষ্ট্র পরিচালনাও একটি বিজ্ঞান এবং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন এই কাজটি অনেক বেশি জটিল।

একাধিক মন্ত্রণালয়ে দেখা যাচ্ছে একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং এক বা একাধিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত একজন উপদেষ্টা রয়েছেন, যারা সরাসরি উপরমহলে রিপোর্ট করেন। এক্ষেত্রে সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য ছিল তাদের একটি টিম হিসেবে কাজ করানো। কিন্তু বাস্তবে প্রায়শই তেমনটি দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো কাজ করেন। এর ফলে, কার কাছে রিপোর্ট করতে হবে বা কার কাছ থেকে নির্দেশনা নিতে হবে, সেটা নিয়ে জটিলতায় পড়েন আমলারা। এই বাস্তবতায় প্রভাব খাটানো, স্বজনতোষণ ও দুর্নীতির জন্য একটি বিপজ্জনক সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি এমন এক স্ব-নির্মিত বয়ান ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলছে, যা তাকে কঠিন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাপকভাবে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, জুলাই সনদকে যে গুরুত্ব ও গভীরতার সঙ্গে দেখা উচিত, বিএনপি তা দেখছে না এবং নির্বাহী বিভাগের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমে যাবে, এমন ক্ষেত্রগুলোতে সনদটি বাস্তবায়নের পথে এগোবে না।

মনে রাখতে হবে, আমাদের সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে কার্যত সীমাহীন ক্ষমতা দিয়েছে। সেই ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত দুর্বল। সংসদ ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর যে তদারকি ক্ষমতা আছে, তাও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের আধিপত্যের কারণে। আরও পরিহাসের বিষয় হলো, বিরোধীদলীয় এমপিদের ওয়াকআউট, বয়কট ও শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের যে সংস্কৃতি অতীতে ছিল, সেটা সংসদ নেতার প্রশ্নহীন ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিতো। কারণ, বিরোধীদল না থাকলে ক্ষমতাসীন দল যা ইচ্ছা তাই করতে পারে।

জুলাই সনদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক ক্ষমতা কমানো এবং তাকে সংসদের কাছে আরও জবাবদিহিমূলক করা। কিছু ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে দেওয়ার প্রস্তাবও সেই চেতনা থেকেই এসেছে। জুলাই সনদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক ব্যবস্থা রয়েছে, যেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে আমাদের ক্ষমতা কাঠামোর গণতান্ত্রিকীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এর মধ্যে ১১৩টি ত্রয়োদশ সংসদ অনুমোদন করেছে, যার বেশিরভাগই রুটিন বিষয় নিয়ে ছিল। বাকি ২০টি হয় বাতিল করা হয়েছে, নয়তো মেয়াদোত্তীর্ণ হতে দেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ অধ্যাদেশগুলোতে স্বাধীন বিচার বিভাগ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশনসহ প্রকৃত সংস্কারের বিষয়গুলো ছিল। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এগুলোর লক্ষ্য ছিল নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা কমানো। এগুলো নতুন করে প্রণয়নের ক্ষেত্রে কারণ দেখানো হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দল এসব বিধানকে আরও কার্যকর করতে চায়।

গুম ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত দুটি বিলের ক্ষেত্রে এখন আমরা চূড়ান্ত রূপটি দেখতে পাচ্ছি। এই দুটি বিল হয়তো খুব শিগগির আইনে পরিণত হবে। জুলাই সনদ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে প্রস্তাবিত এই আইনগুলো ‘জবাবদিহিমূলক শাসন’ প্রতিষ্ঠায় বিএনপি কতদূর যেতে ইচ্ছুক, সে বিষয়ে তাদের মানসিকতার একটি আভাস দেয়। যে আভাসের উপসংহার জনগণের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম সন্তোষজনক। আগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ বলা হতো। বিলটির আলোকে নতুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এখন আর সেটাও বলা যাবে না। সর্বোচ্চ বলা যেতে পারে, ‘নখদন্তহীন বিড়াল বা ইঁদুর’। গুম-সংক্রান্ত বিলের ক্ষেত্রেও মূল্যায়নটা একই।

এই দুটি বিল আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে যে, হয় বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি, না হয় নিজেকে এমন বিধিনিষেধ ও জবাবদিহির আওতায় আনতে চাইছে না, যা জুলাই সনদের মূল দাবি।

শেখ হাসিনা কেন ব্যর্থ হয়েছেন? অন্য অনেক কারণের পাশাপাশি এর একটি সরল উত্তর হলো, তিনি এমন কোনো ‘স্বাধীন’ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে দেননি, যেখান থেকে তাকে ও তার সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী যদি ‘জবাবদিহিমূলক শাসন’ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে চান, তাহলে তাকে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে, যেগুলো সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখার মতো যথেষ্ট স্বাধীন। ড্যারন অ্যাসেমোগ্লু ও জেমস এ রবিনসনের ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘হোয়াই ন্যাশনস ফেইল’ বইটি বিভিন্ন দেশের, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতা ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে। বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হলো, যেসব দেশ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়, তারা উন্নয়ন ধরে রাখতে বেশি সক্ষম হয়। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছাড়া একটি দেশ স্বল্পমেয়াদে অগ্রগতি দেখতে পেলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ব্যক্তির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় লক্ষ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। বিএনপি কি আদৌ সেই শিক্ষা গ্রহণ করবে?

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

Share post:

Popular

More like this
Related

ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, তৃতীয় টোকিও, প্রথম কে?

জনসংখ্যার দিক থেকে জাপানের টোকিওকে পেছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয়...

সৌদি-যুক্তরাজ্য থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে, কমেছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা থেকে

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, ২০২৫-২৬...

ম্যারাডোনার জন্যই আর্জেন্টিনা সমর্থন করি: জাহিদ হাসান

নব্বই দশকের টেলিভিশন নাটকের অন্যতম শীর্ষ তারকা অভিনেতা জাহিদ...

শীতকালীন ঝড়ে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জরুরি অবস্থা

শক্তিশালী শীতকালীন ঝড়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্কুল বন্ধ, হাজারো...