আর্থিক চাপ সামলাতে সম্পদ বিক্রির পথে সিটি গ্রুপ

Date:

ঋণের চাপ সামলাতে ও মূল ব্যবসা নজর দিতে কিছু সম্পদ বিক্রির কথা ভাবছে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপ।

একই সঙ্গে মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী করতে এবং ঋণ নির্ভরতা কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা ভাবছে গ্রুপটি। এর মধ্যে আছে কৌশলগত দেশি ও বিদেশি অংশীদার এবং প্রাইভেট ইক্যুইটি বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ আনা। এ ছাড়া কিছু ব্যবসাকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করছে তারা।

কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো সিটি গ্রুপের এক চিঠিতে এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই চিঠির একটি অনুলিপি দেখার সুযোগ পেয়েছে দ্য ডেইলি স্টার।

সিটি গ্রুপের কর্মকর্তা এবং ঋণ দেওয়া ব্যাংকাররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গ্রুপটি তাদের চা-বাগান, এলপিজি ব্যবসা, হোসেন্দী ইকোনমিক জোন (অর্থনৈতিক অঞ্চল) এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেল বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছে।

এ বিষয়ে জানতে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাসানের সঙ্গে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছে দ্য ডেইলি স্টার। তবে তার দিক থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লেখা চিঠিতে মো. হাসান নগদ অর্থের প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, অর্থের জোগান বাড়ানো এবং ঋণের পরিমাণ কমাতে তিন বছর মেয়াদি একটি সুনির্দিষ্ট পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এ জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী সহায়তা চেয়েছেন।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, এই পুনরুদ্ধার পদক্ষেপ এবং ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সহযোগিতায় আগামী তিন বছরের মধ্যে গ্রুপের আর্থিক অবস্থা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ নিয়ে আগ্রাসীভাবে ব্যবসার সম্প্রসারণ করেছে সিটি গ্রুপ।

তাদের মতে, এই সম্প্রসারণের বড় অংশই ছিল সিমেন্ট, এলপিজি, চা, গণমাধ্যম এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে। একটি লাভজনক ব্যবসার মুনাফা অন্য দুর্বল ব্যবসায় খাটানো হয়েছে। এই চর্চার কারণেই আজ পুরো গ্রুপটি আর্থিক চাপে পড়েছে।

এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী ইকোনমিক জোন গ্রুপটির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।

ব্যাংকাররা জানান, ১০৮ একর জায়গার ওপর এই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে গ্রুপটি প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। সরকারের গ্যাস পাওয়ার অনুমোদনের ভিত্তিতে সেখানে ছয়টি শিল্পকারখানাও স্থাপন করা হয়। কিন্তু এখনো গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় বিশাল বিনিয়োগের পরও কারখানাগুলো অলস পড়ে আছে। তাই সিটি গ্রুপ এখন এই প্রকল্প বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছে।

এ ছাড়া ২০১৫ সালে ব্র্যাকের কাছ থেকে প্রায় ১২০ কোটি টাকায় কেনা চট্টগ্রামের ব্র্যাক বাঁশখালী চা-বাগানটিও বিক্রির কথা ভাবছে শিল্পগোষ্ঠীটি।

সিটি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্পাইস টেলিভিশন লিমিটেডের অধীনে ২০২২ সালে চালু হওয়া ‘এখন টিভি’ নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। টেলিভিশন চ্যানেলটিতে নতুন বিনিয়োগ আনা বা এটি বিক্রি করে দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি শীর্ষ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিপুল ঋণের বোঝা এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বের অদক্ষতার কারণেই সিটি গ্রুপ আজ এমন আর্থিক সংকটে পড়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের ঋণ শোধ করার জন্য আমরা এখন ওই সব অ-প্রধান ব্যবসা বা সম্পদ বিক্রি করার জন্য চাপ দিচ্ছি।

১৯৭২ সালে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় ‘সিটি অয়েল মিলস’ স্থাপনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রহমান। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর শিল্পগোষ্ঠীটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন সন্তানেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর তথ্যমতে, ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিটি গ্রুপের বর্তমানে বকেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

ঋণদাতাদের মধ্যে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, শীর্ষ দেশীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা থেকেও অর্থায়ন পেয়েছে গ্রুপটি।

দেশীয় বড় ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ডাচ-বাংলা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সরকার ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো চালুর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং এ জন্য একটি সহায়তা প্যাকেজও ঘোষণা করেছে।

তিনি বলেন, এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে যে, ব্যবস্থাপনা বা অন্য কোনো কারণে সাময়িক সংকটে পড়া একটি আর্থিকভাবে মজবুত শিল্পগোষ্ঠীকে বিদ্যমান নীতির আওতায় কীভাবে সহায়তা করা যেতে পারে।

আরিফ হোসেন খান বলেন, নানা কারণে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থনীতির স্বার্থেই ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া একটি সম্ভাবনাময় কোম্পানিকে রক্ষা করা জরুরি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যা জানিয়েছে সিটি গ্রুপ

বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া চিঠিতে সিটি গ্রুপ তাদের আর্থিক ও পরিচালনগত সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন, ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট এবং ঋণ পাওয়ার শর্ত কঠিন হওয়া।

গ্রুপটি জানিয়েছে, গত চার বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার প্রায় ৪২ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। এতে আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে এবং তাদের অনুমোদিত ঋণসুবিধার প্রকৃত মান কমে গেছে। এর ফলে তাদের আমদানি অর্থায়নের সক্ষমতা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার কমেছে বলে তারা হিসাব করেছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের হার ৪ থেকে ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। অন্যদিকে ২০২২ সাল থেকে মার্কিন ডলারে নেওয়া ঋণের খরচ প্রায় তিন গুণ হয়েছে। এতে নগদ অর্থের প্রবাহ ও পরিচালন মুনাফার ওপর বড় ধরনের চাপ পড়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস–সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে শিল্পগোষ্ঠীটি জানায়, বড় বিনিয়োগের পরও গ্যাস না থাকায় হোসেন্দী ইকোনমিক জোনের বেশ কয়েকটি কারখানা অলস পড়ে আছে বা উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম কাজ করছে।

চাপ সামলাতে সিটি গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুরোধ করেছে, যাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয় ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার। পাশাপাশি চলতি মূলধনের জোগান অব্যাহত রাখারও অনুরোধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঋণ পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমর্থন চেয়েছে গ্রুপটি। একই সঙ্গে ২০২২ সালে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার সময় হওয়া বৈদেশিক মুদ্রার লোকসান সমন্বয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান একটি স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলোকে মেয়াদি ঋণ দেওয়ারও অনুরোধ করেছে তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পর গত ১৮ জুন রাজধানীর একটি হোটেলে সিটি গ্রুপের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা। সেখানে গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনসহ কীভাবে তাদের কার্যক্রম চালু রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে ঋণদাতা ব্যাংকগুলো শীর্ষ ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। এই কমিটির কাজ হলো, সিটি গ্রুপের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করা এবং সম্ভাব্য সহায়তার বিষয়ে সুপারিশ করা।

কমিটিতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইউসিবি, প্রাইম ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংকসহ আরও বেশ কয়েকটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা রয়েছেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, গ্রুপটিকে কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতেই তাদের অনুরোধে ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা বৈঠকে বসেন।

দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই সম্মিলিতভাবে গ্রুপটিকে সাহায্য করতে চাই। বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যে তাদের কীভাবে সহায়তা করা যায়, তার সন্ধান করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ৫৩ বছরের ইতিহাসে সিটি গ্রুপ কখনো ঋণখেলাপি হয়নি, ব্যাংকগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সব সময়ই ভালো ছিল এবং তারা ঋণের অর্থ অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়নি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, শুধু অব্যবস্থাপনার কারণেই গ্রুপটি আজ এমন সংকটে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে গ্রুপটি বড় ধরনের সংকটে পড়লে পুরো ব্যাংকিং খাত এবং বৃহত্তর অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর আমরা মূল্যায়ন করব যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম মেনে তাদের কীভাবে সহায়তা করা যায়।’

Share post:

Popular

More like this
Related

‘খোয়াই নদী এখন হবিগঞ্জের সবচেয়ে বড় ডাস্টবিন’

নদীকে কেন্দ্র করে যে জীবন ব্যবস্থা, সভ্যতার কথা বলা...

স্টারডম ও মেডিকেলের পড়ালেখা সামলে শ্রীলীলা এখন ‘দক্ষিণী কুইন’

ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময় পার করছেন দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী শ্রীলীলা।...

ফিতনা-আল-হিন্দুস্তান ও ফিতনা-আল-খারিজ কী, ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে?

পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে আজ...

ফ্রান্সের গ্রুপে না রেখে পর্তুগালের গ্রুপে কেন উজবেকিস্তান?

২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র এর পরই সমর্থকদের মধ্যে বিতর্ক চলছে,...