যখন আবেগ সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়

Date:

ব্র্যাক ব্যাংক অপরাজেয় আলো নারী হকি টুর্নামেন্টের ফাইনালের স্কোরলাইন দেখে একপেশে লড়াই মনে হলেও, প্রতিযোগিতাটি আসলে বাংলাদেশের নারী হকির বর্তমান অবস্থা ও চেতনা নিয়ে অনেক গভীর ও সমৃদ্ধ গল্প তুলে ধরেছে।

শনিবার মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে ফেভারিট বিকেএসপি ৮-০ গোলে জোন-২ দলকে উড়িয়ে দেয়। জোন-২ দলটি গঠিত হয়েছিল ঢাকা ও ময়মনসিংহের মেয়েদের নিয়ে। তবে এই টুর্নামেন্টের মূল গল্পটি জয়-পরাজয়ের ব্যবধান নয়; বরং দেশের নানা প্রান্তের মেয়েদের অধ্যবসায় ও সীমিত সুযোগের মাঝেও খেলাটির প্রতি তাদের ভালোবাসাই ছিল আসল বিষয়।

পুরুষ হকির মতোই বাংলাদেশের নারী হকিও বড় পরিসরে বিকেএসপি খেলোয়াড়দের ওপর নির্ভরশীল। তবে ১৮টি জেলা থেকে ৩৫০–এর বেশি খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণকে ভবিষ্যৎ নারী হকির সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে সিলেটের মতো দলগুলো বিশেষ উদ্দীপনা দেখিয়েছে।

সিলেটের মেয়েদের গল্পই এই টুর্নামেন্টের আসল সত্তাকে ধারণ করে। শুরুতে তারা ছাতার বাঁকানো হাতল দিয়ে হকির সঙ্গে পরিচিত হয়, ছাতার ডাঁটা ধরে বল নিয়ন্ত্রণ শেখে। পরে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন (বিএইচএফ) তাদের ১৮টি উপযুক্ত হকি স্টিক সরবরাহ করে।

ছাতার হাতল দিয়ে অনুশীলন থেকে শুরু করে তাদের দুই খেলোয়াড় প্রিমা বেগম ও নূরী আক্তার, ফাইনাল পর্বে পৌঁছানো ছিল তাদের অভিযোজন ক্ষমতা ও শেখার আগ্রহের স্পষ্ট প্রমাণ। টুর্নামেন্টটি শুরু হয়েছিল জোনাল পর্ব দিয়ে, যেখানে ১৮টি জেলাকে চারটি জোনে ভাগ করা হয়। প্রতিটি জোন থেকে সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত একটি করে দল ঢাকায় অনুষ্ঠিত ফাইনাল পর্বে খেলার সুযোগ পায়। এফআইএইচ স্বীকৃত কোচদের অধীনে সারা বছর কৃত্রিম টার্ফে অনুশীলন করা বিকেএসপি সরাসরি পঞ্চম দল হিসেবে ফাইনাল পর্বে অংশ নেয়।

ফাইনালের বড় ব্যবধানের স্কোরলাইন সত্ত্বেও রানার্সআপ দল পুরোপুরি অসহায় ছিল না। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও নিয়মিত ম্যাচ খেলার অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা বল চালাচালিতে কিছু ইতিবাচক দিক দেখিয়েছে। গতি নিয়ে বল বহন, পরিপাটি কয়েকটি পাস এবং এমনকি বিকেএসপির আক্রমণভাগে ঢুকে পড়ার মতো মুহূর্তও ছিল তাদের। তবে শেষ পর্যন্ত দক্ষতা, ফিটনেস ও অভিজ্ঞতার ঘাটতিই ব্যবধান গড়ে দেয়। 

তাদের প্রচেষ্টার প্রতিফলন দেখা গেছে ব্যক্তিগত পুরস্কারেও। ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় ফারদিয়া আক্তার রাত্রি, সেরা গোলকিপার মহুয়া এবং উদীয়মান তারকা অপূর্ব আক্তার, তিনজনই ছিলেন বিকেএসপির বাইরে থেকে আসা। অন্যদিকে বিকেএসপির অর্পিতা পাল ও আইরিন আক্তার রিয়া যথাক্রমে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন।

‘বিকেএসপির বাইরে থাকা মেয়েদের জন্য বিষয়টি সত্যিই কঠিন, কারণ আমরা ঘাসের মাঠে খেলি এবং কৃত্রিম টার্ফে মানিয়ে নেওয়া কঠিন,’ বলেন রাত্রি। জাতীয় ফরোয়ার্ড রাকিবুল হাসান রকির ছোট বোন রাত্রি আরও যোগ করেন, বিকেএসপির খেলোয়াড়দের যদি দলগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো, তাহলে ফাইনাল পর্ব আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতো।

‘সারা বছরই আমি বসে ছিলাম, শুধু টুর্নামেন্টের সময় খেলতে নেমেছি,’ বলেন অপূর্ব। ‘সারা বছর প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলে আমরা আরও উন্নতি করতে পারতাম। আমি জাতীয় দলে খেলতে চাই।’

আইরিনও স্বীকার করেন, নিয়মিত আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার কারণে বিকেএসপির খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা বেশি, আর সে জায়গায় বিকেএসপির বাইরে থাকা খেলোয়াড়রা পিছিয়ে।

এ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্ট থেকে ২৫ জন খেলোয়াড়কে মধ্য জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করা হয়েছে। একই সঙ্গে এশিয়ান গেমস বাছাইয়ের আগে মার্চে একটি জাতীয় ক্যাম্প আয়োজনের কথাও ভাবছে ফেডারেশন। ব্র্যাক ব্যাংকের সিইও ও এমডি তারেক রেফাত উল্লাহ খানের নারী হকিতে অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি এবং বিএইচএফের উদ্যোগী মানসিকতা থাকলে, ছাতার হাতল দিয়ে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টই হয়তো ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী নারী হকির পথে প্রথম ধাপ হয়ে উঠবে।

 

Share post:

Popular

More like this
Related

৭২ এর সংবিধানের কথা বলা মানে জিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থা নেওয়া: জামায়াত আমির শফিকুর

৭২ এর সংবিধানের পক্ষে কথা বলা মানে জিয়াউর রহমানের...

এক পোর্টালে সব ধরনের ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর কথা ভাবছে সরকার

খরচ কমাতে ও ব্যবসা সহজ করতে একক অনলাইন পোর্টালের...

‘ডালাসে ববিতা ডে ঘোষণা ইতিহাসের অংশ, ভাবতেই ভালো লাগে’

বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা যুক্তরাষ্ট্রে ‘আনন্দমেলা আজীবন সম্মাননা’ পাওয়ার...

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহত ৪০, আহত ২৪৬

লেবাননে গত দুদিনের ইসরায়েলি হামলায় ৪০ জন নিহত ও...