যেভাবে এড়িয়ে চলবেন ডিপফেকের ফাঁদ

Date:

অনলাইনে দেখা কোনো ছবি বা ভিডিও সত্যি, নাকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি, তা বোঝা দিন দিন কঠিন হচ্ছে। আগে ছবির অস্বাভাবিকতা দেখে ভুয়া কনটেন্ট চেনা যেত। এখন সেই সুযোগও কমে এসেছে। তাই শুধু চোখের দেখায় বিশ্বাস না করে তথ্যের উৎস, ঘটনার প্রেক্ষাপটও যাচাই করা জরুরি।

একসময় এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা ভিডিওতে কিছু অস্বাভাবিকতা থাকত। কারও হাতে আঙুল বেশি দেখা যেত, মুখের গড়নে অসঙ্গতি কিংবা চোখের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ত। এখন প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এসব ত্রুটি অনেকটাই দূর হয়েছে।

অনলাইন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নর্ডভিপিএনের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মারিজুস ব্রিয়েডিস প্রযুক্তি সাময়িকী ম্যাশেবলকে বলেন, এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টের পুরোনো ত্রুটিগুলো এখন আর সহজে চোখে পড়ে না। আর নতুন কোনো ত্রুটি শনাক্ত করার কৌশল প্রকাশিত হলে এআই কোম্পানিগুলো দ্রুত সেটি ঠিক করে ফেলেন। ফলে শুধু ছবির দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য দেখে ভুয়া কনটেন্ট চেনার কৌশল বেশিদিন কার্যকর থাকে না।

এতে শুধু ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিই বাড়ছে না, বাড়ছে আর্থিক প্রতারণাও।

তাহলে চোখের দেখায় বিশ্বাস করা না গেলে কী করবেন? বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিজের আবেগ, যুক্তিবোধ এবং ডিজিটাল যাচাইয়ের উপায় কাজে লাগাতে হবে।

Deepfakes demystified: An introduction to the controversial AI tool | The  Daily Star

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ছবি বা ভিডিওতে এআইয়ের ভুল খোঁজার চেয়ে সেটির উৎস যাচাই করা বেশি জরুরি।

ধরা যাক, কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের একটি ছোট ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি দেখেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার খুঁজে বের করুন। একই ঘটনা নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যম কী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা-ও দেখুন।

ক্লাউড নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান মিটিগার গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক রোই শেরম্যান বলেন, ছোট ভিডিও থেকে অনেক সময় মূল ঘটনার প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া হয়। আর সেখানেই বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ থাকে।

ছবির উৎস খুঁজতে গুগলের রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এটিও সব সময় নির্ভরযোগ্য নয়। ভুয়া তথ্য শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠান নিউজগার্ডের জ্যেষ্ঠ সম্পাদক সোফিয়া রুবিনসন জানান, গুগলের এআইভিত্তিক সার্চ অনেক সময় ভুল ছবিকে ভুল ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে দেখায়। ফলে ভুয়া তথ্য আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

Deepfake technology for entertainment: the pros and cons - Motion Analysis

এমনকি কোনো ছবি বা ভিডিওর উৎস দেখতে বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও সেটি আসল, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই উৎস যাচাইয়ের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। যে অ্যাকাউন্ট থেকে তথ্যটি এসেছে, সেটি কত দিনের পুরোনো? একই তথ্য কি অন্য নির্ভরযোগ্য সূত্রেও পাওয়া যাচ্ছে? আর কেউ কি আপনাকে দ্রুত কিছু করার জন্য চাপ দিচ্ছে? দিলে কেন?

ব্রিয়েডিসের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ছবির প্রতিটি পিক্সেল বা ভিডিওর শব্দতরঙ্গ বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নেই। সাধারণ বুদ্ধি দিয়েই অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহজনক বিষয় চিহ্নিত করা সম্ভব।

কোনো পোস্ট দেখে খুব রাগ হচ্ছে? আতঙ্কিত বা উত্তেজিত বোধ করছেন? তাহলে একটু থামুন।

কোনো ঘটনা সত্য কি না, তা বোঝার জন্য একাধিক সূত্রে মিলিয়ে দেখুন। ঘটনাটি আদৌ ঘটার মতো কি না, সেটিও ভাবুন। কোনো পরিচিত ব্যক্তির নামে বক্তব্য ছড়ালে যাচাই করুন, তিনি সত্যিই এমন কথা বলেছেন কি না।

শুধু অবিশ্বাস্য বা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়, রাজনীতিবিদদের উসকানিমূলক মন্তব্য কিংবা তারকাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের খবরও যাচাই করা উচিত। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক তথ্যই ভুয়া হতে পারে। আবার কোনো খবর সত্য হলেও যাচাই ছাড়া সেটি ছড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

Deepfake Techniques Explained: Why Some Work in Real-Time and Others Don't  by Niv Amitay

নিজে যাচাই করেও কোনো ছবি বা ভিডিও সম্পর্কে নিশ্চিত হতে না পারলে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
নিউজগার্ড এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ম্যাকাফিও তাদের ব্লগে এআইভিত্তিক প্রতারণার বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে। আর ডিপফেক শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠান এআই অর নটের ওয়েবসাইটে পরিচিত ভুয়া ছবি ও পরিবর্তিত কনটেন্টের তথ্যভান্ডার রয়েছে।

এ ছাড়া ডিপফেক শনাক্তের প্রযুক্তি উন্নত করতে কাজ করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন দেশে আইন প্রণয়ন এবং কনটেন্টের উৎস শনাক্ত করার প্রযুক্তিও এ ক্ষেত্রে সহায়তা করছে।

তবে কোনো অপতথ্য শনাক্তকারী টুলই শতভাগ নির্ভুল নয়। তাই একটি টুল কোনো ছবি বা ভিডিওকে আসল কিংবা নকল বললেই সেটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে নেওয়া যাবে না।

ব্রিয়েডিসের মতে, কোনো কনটেন্ট দেখে সন্দেহ হলে শনাক্তকারী টুল প্রাথমিক ধারণা দিতে পারে। কিন্তু এরপরও যথাযথভাবে সেটির উৎস যাচাই করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের সবশেষে পরামর্শ, কোনো ছবি বা ভিডিও সত্য কি না, নিশ্চিত হতে না পারলে সেটি শেয়ার করবেন না। কারণ যাচাই না করে একটি ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে দিলে অন্যরাও বিভ্রান্ত হতে পারেন।

সূত্র: ম্যাশেবল

Share post:

Popular

More like this
Related

খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে ফিরবেন আশা চিকিৎসকদের: ডা. জাহিদ

কোনো ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির...

মেট্রোরেলের ১০০ কোটি ডলারের চুক্তি পেল ভারতের এলঅ্যান্ডটি

ভারতের অবকাঠামো খাতের বড় প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (এলঅ্যান্ডটি)...

অস্ট্রেলিয়ায় গান নিয়ে ব্যস্ত ঐন্দ্রিলা

অভিনয়, গান, নাচ ও উপস্থাপনায় ছোটবেলা থেকেই যুক্ত ঐন্দ্রিলা...

বিপ্লব-পরবর্তী নেপালের নির্বাচনে আলোচিত ৩ প্রার্থী

গত বছরের সেপ্টেম্বরে জেন-জি প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত গণঅভ্যুত্থানে নেপালের...