স্বাস্থ্যখাতের দুরবস্থা: সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কি স্বপ্নই থাকবে?

Date:

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে কথা বলতে গেলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক করুণ চিত্র। একদিকে সরকারি হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই, অন্যদিকে বাজেট বরাদ্দের বড় অংশ বছরের পর বছর অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা এখন আর মৌলিক অধিকার নয়, বরং বিশাল দুর্ভেদ্য পাহাড় ডিঙানোর মতো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি কেন অবহেলার শিকার হচ্ছে এবং কীভাবে আমরা এই অকার্যকর অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারি, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সময় এসেছে।

জীবিকার সুবাদে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছে। একজন জনস্বাস্থ্য কর্মী ও গবেষণার তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, প্রতিষ্ঠিত জার্নালে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন বা কেস স্টাডি দেখে যে তাত্ত্বিক রূপরেখা পাওয়া যায়, বাস্তব চিত্র তারচেয়েও অনেক বেশি নাজুক ও ভঙ্গুর।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে হলে যেকোনো সরকারি হাসপাতালে বা সেবাকেন্দ্রে গিয়ে এর সিস্টেমের গলদগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তাহলেই উত্তরণের পথ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ‘সরকারি হাসপাতালের শয্যা বাড়ছে, কিন্তু ডাক্তার কোথায়?’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের এই খাঁটি ও রূঢ় বাস্তবতাকে সংখ্যাতাত্ত্বিক তথ্যের মাধ্যমে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনটির তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা শয্যা সংখ্যা বাড়ানো হলেও সেই অনুপাতে জনবল বা চিকিৎসক বাড়েনি। ফলে, এই তীব্র সংকট পুরো সেবা ব্যবস্থাটিকে ভেতরে ভেতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংখ্য পদ খালি পড়ে আছে, যার মধ্যে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চিকিৎসা শিক্ষার শিক্ষক পর্যন্ত রয়েছেন। এই বিশাল শূন্যপদের কারণে একদিকে যেমন রোগীরা উপযুক্ত সেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের পড়াশোনা ও মান নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠছে।

এই অব্যবস্থাপনার আরেকটি অন্ধকার দিক হলো, কেনাকাটা ও বাজেট বাস্তবায়নের ধীরগতি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুতে যে বিশাল বাজেট ছিল, সংশোধিত বাজেটে এসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তা কয়েক হাজার কোটি টাকা কমে যায়। এই অপচয় ও ধীরগতির অর্থ হলো, সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় ওষুধ, আধুনিক যন্ত্রপাতি বা চিকিৎসা সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলা সদরের হাসপাতালগুলোতে একটি ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে বা নিচতলা থেকে উপরতলায় রোগী স্থানান্তরের মতো সাধারণ কাজের জন্যও রোগীর স্বজনদের অতিরিক্ত অর্থ বা ‘বকশিশ’ দিতে বাধ্য করা হয়। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে বড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত সবজায়গায় সেবা পেতে হলে ঘুষ বা অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বৈষম্যটি দৃশ্যমান হয় কিছু চিকিৎসকের তৎপরতায়। একই চিকিৎসক যখন সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি এক অদৃশ্য সীমাবদ্ধতায় বন্দি। অথচ বেসরকারি ক্লিনিকে গেলেই তিনি দারুণ সক্রিয় হয়ে যান। এটি কেবল চিকিৎসকের একক দোষ নয়, বরং আমাদের সরকারি কর্মক্ষেত্রের জবাবদিহিতা ও অনুন্নত পরিবেশের প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি। এর ফলে ধনীরা বেসরকারি বিশেষায়িত অত্যাধুনিক হাসপাতালে আধুনিক সেবা পেলেও গরিব ও প্রান্তিক মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে বা সহায়-সম্বল বিক্রি করে পথে বসছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাস্থ্যখাতে মোট জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ করা উচিত এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর একটি নির্দিষ্ট অনুপাত (১:৩) বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশেরও কম, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) বা সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল কথাই হলো—চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো নাগরিক যেন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়েন। আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতা এই আন্তর্জাতিক নির্দেশনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

একজন জনস্বাস্থ্য গবেষণা কর্মী এবং এ দেশের সচেতন মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, এই নাজুক পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় কিংবা অবকাঠামো বা শয্যার সংখ্যাগত বৃদ্ধির মধ্যে নিহিত নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিধিবদ্ধ তথ্য-উপাত্তের সঠিক প্রয়োগ এবং উভয় পক্ষের, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর মানসিকতার আমূল পরিবর্তন। আমাদের পর্যাপ্ত সম্পদ আছে, অভাব শুধু সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতার।

বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর সুপারিশ তুলে ধরা হলো:

১. প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় স্বাধীনতা: ঢাকার ওপর সমস্ত নির্ভরতা কমিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে বাজেট প্রণয়ন ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা দিতে হবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী যেন দ্রুত সরঞ্জাম বা ওষুধ কেনা যায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

২. নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতিশীলতা ও জনবল সংকট দূরীকরণ: দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত শূন্যপদগুলোর দিকে নজর রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। বিশেষ করে চিকিৎসা শিক্ষা অধিদপ্তরের শূন্যপদগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পূরণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের মানসম্মত শিক্ষা ব্যাহত না হয়।

৩. ডিজিটাল মনিটরিং ও কেনাকাটায় স্বচ্ছতা: সরকারি অর্থ ও বাজেট যেন বছরের শেষে ফেরত না যায়, সেজন্য বছরের শুরু থেকেই ক্রয়ের পরিকল্পনা করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধের স্টক ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারি (ই-গভর্নেন্স) করতে হবে, যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও কেনাকাটার দুর্নীতি বন্ধ হয়।

৪. চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা ও প্রণোদনা প্যাকেজ: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, নিরাপত্তা ও আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে বায়োমেট্রিক হাজিরা ও কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে সেবার মানের বৈষম্য দূর করতে হবে।

৫. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) ও মান নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, সরকার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর সেবামূল্য নির্ধারণ ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করবে। প্রয়োজনে সরকারি খরচে বেসরকারিখাতের মাধ্যমে দরিদ্র রোগীদের সাশ্রয়ী বা বিনামূল্যে জটিল চিকিৎসা দেওয়ার জন্য অংশীদারিত্ব চুক্তি করা যেতে পারে।

৬. তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিক তদারকি কমিটি: হাসপাতালের সেবার মান ও দুর্নীতি প্রতিরোধে স্থানীয় সচেতন নাগরিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও রোগীর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে রিপোর্ট করবে।

৭. স্বাস্থ্য বিমা ও সবার জন্য স্বাস্থ্য (ইউএইচসি) বাস্তবায়ন: প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত মানুষের চিকিৎসা খরচ কমাতে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালু করা সময়ের দাবি। এতে করে কোনো পরিবারকে চিকিৎসার জন্য জমি বা সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হতে হবে না।

স্বাস্থ্যসেবা করুণা বা দয়ার দান নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত মৌলিক অধিকার। আমাদের স্বাস্থ্যখাতকে ঢেলে সাজানোর জন্য বড় বাজেট ঘোষণার চেয়েও বেশি প্রয়োজন সেই বাজেটের সঠিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও সময়োপযোগী প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন। একজন জনস্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সংকটের পথ যতই কঠিন হোক না কেন, সদিচ্ছা, মানবিক মূল্যবোধ ও সাহসের সঙ্গে কার্যকর উদ্যোগ নিলে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে চিকিৎসার অভাবে কোনো গরিব মায়ের বুক খালি হবে না এবং দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল হবে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে আস্থার ঠিকানা।

সুমিত বণিক: জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক, ঢাকা
[email protected]

Share post:

Popular

More like this
Related

‘মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায়’ নিজ বাড়িতে ককটেল হামলা, যুবক কারাগারে

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় নিজের বাড়িতে ককটেল হামলা চালানোর অভিযোগে...

‘এটা আমাদেরই গল্প’ নাটকের শেষ পর্ব নিয়ে যা জানা গেলো

দর্শকদের মাঝে আলোচিত ধারাবাহিক নাটক ‘এটা আমাদেরই গল্প’। যার...

নারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি দিল ইরান

ইরানে নারীরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স নিতে পারবেন,...

আইপিএল নিলামের চূড়ান্ত তালিকায় বাংলাদেশের ৭ জনের সবাই বোলার

আগামী ১৬ ডিসেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত হবে...