বিএনপির পরবর্তী মহাসচিবের কাছে যেসব প্রত্যাশা

Date:

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন। আমাদের বিশ্বাস, পূর্বতন ব্যক্তি এই পদের যে মর্যাদাহানি করেছিলেন, তার অনেকটাই তিনি ফিরিয়ে আনবেন।

নির্ভরযোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা, শালীনতা এবং দলের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের ‘মূর্ত প্রতীক’ হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন মির্জা ফখরুল। আমরা স্মরণ করতে পারি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাকে কী ভয়াবহ নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভীসহ আরও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার মতো তাকেও জামিন না পেয়ে মাসের পর মাস কারাগারে থাকতে হয়েছে।

এখানে উল্লেখ্য, বিএনপির স্থায়ী কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্ধারণ না করে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দলীয় প্রধানের ওপর ছেড়ে দেয়। আর এভাবেই দলের নেতারাই দলীয় প্রধানকে অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান করে তোলেন। এখানে তারেক রহমানও সবার মতামতের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি নীতিনিষ্ঠ ও প্রয়োজনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। সেক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিবেচনায় সহজেই অনুমেয়, সবাই দলীয় প্রধানের পছন্দটি আঁচ করে সেই অনুযায়ীই নিজেদের মতামত দিতেন। তাতে ফলাফল হয়তো একই থাকত, কিন্তু সেটা সম্মিলিত সিদ্ধান্ত বলে প্রতিষ্ঠিত হতো। অথচ, এমন একটি প্রত্যাশিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ হাতছাড়া হলো।

মো. আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির শূন্য পদটিতে কে বসবেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছিল। বিভিন্নজনের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, দলীয় আনুগত্য, প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্যসহ আরও নানা ধরনের মাপকাঠিতে কে এগিয়ে তা নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু, আওয়ামী লীগের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতা, কোনো সাবেক বা কর্মরত আমলা কিংবা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতদের কেউ মো. সাহাবুদ্দিনের নাম বলেননি বা এই নাম নিয়ে কোথাও আলোচনা হয়নি। অথচ, তিনিই রাষ্ট্রপতি হলেন। কোনো সরকারি বা দলীয় যাচাই-বাছাই কিংবা উন্মুক্ত বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে বেছে নেওয়া হয়নি। তিনি ছিলেন একজনের ব্যক্তিগত পছন্দ। দেশের তৎকালীন স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থায় শেখ হাসিনা কতটা খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এটি।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর যে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে তা হলো, দলটির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন? গতকাল বৃহস্পতিবার দলটি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করেছে। নতুন মহাসচিব কে হতে পারেন, সেটা জানতে হয়তো আমাদের দলটির পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি প্রধান ও দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সামনে এমন একজন মহাসচিব বেছে নেওয়ার সুযোগ এসেছে, যিনি বর্তমানের বিশাল ও নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত। মির্জা ফখরুলের মেয়াদের বেশিরভাগ সময় কেটেছে শেখ হাসিনার আক্রমণ মোকাবিলা করে এবং দলটি ভাঙার জন্য যত চাপ ও প্রলোভন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি এই কঠিন দায়িত্ব সফলভাবেই পালন করেছেন।

তার উত্তরসূরিকে দল গড়তে হবে ভিন্ন ধারায়, যাতে জাতি গঠনের চেতনায় নারী, তরুণ, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত হয়। আমরা যে উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে রয়েছি, সেখানে এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। নতুন মহাসচিবকে জেন-জি প্রজন্মের আস্থা অর্জন করতে হবে, যারা একটি সরকার উৎখাতের সক্ষমতা দেখিয়েছে। পাশাপাশি নতুন মহাসচিবকে অত্যন্ত সুসংগঠিত বিরোধীদলের মোকাবিলা করতে হবে, যাদের পরিচিত ও অপরিচিত নেটওয়ার্ক ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে আমাদের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভুলে গেলে চলবে না, যেখানে বিরোধীদল কেবল ‘বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা’ করে ক্ষমতাসীন দলের ইতিবাচক উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত করেছে।

একইসঙ্গে, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে স্বার্থান্বেষী মহলগুলোর সেই দলে যোগ দেওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। কারণ, চারদিকে তখন ‘সুবিধা’ পাওয়ার সুযোগ থাকে। এমনকি পুরোনো ও অভিজ্ঞ তৃণমূল নেতারাও সেইসব লোকজন নিয়েই নিজেদের পাল্লা ভারী রাখেন, যাদের অর্থায়ন এসব স্বার্থান্বেষী মহল থেকেই আসে—সেটা ব্যক্তিগত অর্থায়ন হোক বা দলীয়।

নতুন মহাসচিব বেছে নেওয়ার আগে দলটির সাবেক মহাসচিবদের ভূমিকার ইতিহাস খতিয়ে দেখা প্রাসঙ্গিক হবে বিএনপি প্রধানের জন্য। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব ছিলেন ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, কে এম ওবায়দুর রহমান, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও খন্দকার দেলোয়ার হোসেন এই দায়িত্ব পালন করেন। মির্জা ফখরুল ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান এবং ২০১৬ সালে মহাসচিব নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক দল গঠনের সময় তার ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ হিসেবে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বেছে নিয়েছিলেন। এটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ এবং এখান থেকে শেখার মতো অনেক কিছু আছে। মহাসচিব হিসেবে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এমন অনেক কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ পেয়েছিলেন, যা পরবর্তী মহাসচিবরা পাননি। শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে ছিল প্রকৃত অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। দলীয় প্রধানের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার সঙ্গে তার ডেপুটির রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও যোগাযোগ দক্ষতার সমন্বয় ছিল। বিএনপিতে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর শেষ দিনগুলো সুখকর না হলেও প্রতিষ্ঠাকালীন দিনগুলো ছিল ভিন্ন।

এখান থেকে তারেক রহমানের যে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন তা হলো, কেবল সহমত পোষণ করা কাউকে নয়, তার একজন আন্তরিক অংশীদার দরকার। এমন একজন দরকার, যিনি জাতি গঠনের চেতনায় দলকে নতুন করে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবেন। এমন একজন যার নিজস্ব ধারণা আছে এবং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরবর্তী মহাসচিবের ভিন্নমত প্রকাশের সেই অপরিহার্য ও নৈতিক সাহস থাকতে হবে। সেটা বিরোধিতার মাধ্যমে নয়, বরং বিকল্প পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে। সেই পরামর্শ দেওয়ার স্বাধীনতা তাকে অবশ্যই দেওয়া উচিত।

তারেক রহমান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ধারাটি শুরু করতে পারেন তা হলো, দলীয় পদ ও মন্ত্রিত্বকে আলাদা করা। ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হওয়া আমাদের দেশে যেন অনিবার্য। এত মন্ত্রণালয় থাকতে এই মন্ত্রণালয়টিই কেন? কারণ হতে পারে, দেশজুড়ে এই মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে এবং এর বাজেটও অনেক বড়। এই অর্থের একটি বড় অংশ তৃণমূল পর্যায়ে নানা ধরনের অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। গ্রাম উন্নয়নের কাজও সাধারণত এই মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা হয় এবং এভাবেই সর্বত্র দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই চর্চা স্পষ্টতই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে ‘স্বজনপ্রীতি’র আখড়ায় পরিণত করে, যা আসলে ছদ্মবেশী দুর্নীতি ছাড়া আর কিছুই না। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জনগণের অর্থের এই মিশ্রণের কারণেই প্রতিটি ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তায় ধস নামার সূচনা হয়। ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিবের দায়িত্বটাকেই তার জন্য পূর্ণকালীন পদে পরিণত করা উচিত। প্রোটোকলের জন্য প্রয়োজনে তাকে মন্ত্রী পদমর্যাদা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু মন্ত্রণালয় নয়।

এই জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিপর্যয়কর ব্যর্থতা থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। শেখ হাসিনা বহু প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছেন এবং আওয়ামী লীগ ছিল তার মধ্যে অন্যতম। দলটির পুরো কাঠামো ধসিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল দলীয় প্রধানের হাতে। বছরের পর বছর আমরা দেখেছি, দলটির সর্বোচ্চ ফোরাম বৈঠকে বসেছে এবং তাদের সিদ্ধান্ত হলো, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা নেবেন। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের কাঠামো ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।

তারেক রহমান নতুন মহাসচিব হিসেবে কাকে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বেছে নেবেন, তা অনেক কিছুই প্রকাশ করবে এবং দলের ভবিষ্যৎ গতিপথও নির্ধারণ করবে। বিএনপির দলীয় গঠনতন্ত্র অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। সেখানে দলের প্রধানকে দলীয় নেতৃত্বের যেকোনো স্তরে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাতিল করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। সময়ের সঙ্গে তারেক রহমান ধীরে ধীরে দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন কি না, সেটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে তার স্বপ্নের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করবে। দলীয় নেতাদের কাজ করার জন্য আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে এবং একইসঙ্গে, তারা যেন জবাবদিহিতার আওতায় থাকেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল যুগে এটি সহজেই করা সম্ভব।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে আত্মস্থ করার মতো অনেক কিছু আছে। ক্ষমতার অতিকেন্দ্রীকরণের প্রতি জনগণের মধ্যে স্বাভাবিক অনীহা রয়েছে। মানুষের স্মৃতি যত ক্ষণস্থায়ীই হোক, কিছু মৌলিক মূল্যবোধ তারা ধরে রাখে। নতুন করে বাংলাদেশ গড়ার জন্য তারেক রহমানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজের দলকে ভিন্নভাবে গড়ে তোলার দৃষ্টান্তও থাকতে হবে। আর সেটার শুরুটা হওয়া উচিত নতুন মহাসচিব নিয়োগের মাধ্যমে।

মাহফুজ আনাম: সম্পাদক ও প্রকাশক, দ্য ডেইলি স্টার

Share post:

Popular

More like this
Related

ঢাবির বিজয় একাত্তর হলে আগুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজয় একাত্তর হলের ক্যান্টিনে আগুন লেগেছে।...

ঈদের ৯ নাটকে ৯ রকম চরিত্রে কেয়া পায়েল

নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে...

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেলেন দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট

দেশের জনপ্রিয় নেতা থেকে ঘৃণিত অপরাধী। ১৪ মাসের মধ্যে...

রেকর্ড দাম পেয়ে প্রথমবার কলকাতায় মোস্তাফিজ

মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে পেতে শুরুতেই লড়াইয়ে নামল চেন্নাই সুপার...