ভোলার গ্যাসে বিনিয়োগ না করার সামর্থ্য কি বাংলাদেশের আছে?

Date:

জ্বালানি সংকট দেখা দিলেই দেশীয় গ্যাস ব্যবহারের কথা আলোচনায় আসে। সংকট কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠলেই আলোচনা আর এগোয় না। বারবার এমনটাই ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং গ্যাস অবকাঠামো উন্নয়নে পিছিয়ে পড়েছে। ১৯৯০-এর দশকে ভোলায় গ্যাস আবিষ্কৃত হলেও বারবার দাবি ওঠার পরও তা আজও জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়নি। এখন আবার গ্যাস সংকটের মধ্যে ভোলার গ্যাস জাতীয় আলোচনায় ফিরে এসেছে। সঙ্গে ফিরে এসেছে, এই গ্যাস উত্তোলন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে কি না, সেই প্রশ্নও।

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর উত্তর শুধু একটি পাইপলাইন নির্মাণের খরচের দিকে তাকিয়ে দেওয়া যায় না। আমাদের আরও জানতে হবে, বাংলাদেশ আমদানি করা এলএনজির পেছনে কত অর্থ ব্যয় করছে, ভবিষ্যতে আরও কত ব্যয় করবে এবং এই নির্ভরতা অর্থনীতি, শিল্প ও জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

ভোলায় হারানো সুযোগ

ভোলায় বর্তমানে তিনটি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে: শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ এবং সুন্দরপুর। এসব ক্ষেত্রে সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ আনুমানিক ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ), যার মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৫ টিসিএফ উত্তোলনযোগ্য হতে পারে।

ভোলার বিদ্যমান কূপগুলো থেকে প্রতিদিন প্রায় ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। তবে বর্তমানে বাপেক্স উত্তোলন করছে প্রায় ৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকার আরও ১০টি কূপ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি একটি চীনা কোম্পানি এবং পাঁচটি বাপেক্স খনন করবে। আরও কূপ হলে গ্যাস ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু পাইপলাইন না থাকলে সেই গ্যাস অব্যবহৃতই থেকে যাবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভোলায় এ পর্যন্ত খনন করা প্রতিটি কূপেই গ্যাস পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সাফল্যের হার ১০০ শতাংশ। এই পরিস্থিতিতে ভোলায় পর্যাপ্ত গ্যাস নেই, কিংবা সেখানে বিনিয়োগ লাভজনক হবে না, এমন যুক্তি গ্রহণ করা কঠিন।

ভোলা থেকে পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব নতুন নয়। অন্তত ১৫ বছর ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০১৮ সালে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের একটি পাইপলাইন নির্মাণের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬০০ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে প্রতিদিন ৩৫০–৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পরিবহনের পরিকল্পনা ছিল। এই পরিমাণ একটি আধুনিক এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহক্ষমতার কাছাকাছি।

তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই বিলম্বের জন্য সিদ্ধান্তহীনতা, অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ এবং এলএনজি আমদানির পক্ষে লবিংকে দায়ী করেছেন। ফলে যে প্রকল্পটি ৬০০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা সম্ভব ছিল, এখন তার ব্যয় অন্তত সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। মূল্যস্ফীতি, বিদেশি পরামর্শক, আমদানি করা যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি এবং জমি অধিগ্রহণের কারণে এই ব্যয় ৮-৯ হাজার কোটি টাকায়ও পৌঁছাতে পারে।

এটি শুধু একটি পাইপলাইন প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়। এটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করার উচ্চমূল্যের একটি উদাহরণ।

পরিকল্পনার ব্যর্থতা নাকি আরও কিছু?

স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এটি কি পরিকল্পনাগত ভুলের একটি উদাহরণ? অর্থাৎ ‘আজ সামান্য সাশ্রয় করতে গিয়ে ভবিষ্যতে বিপুল ব্যয়’ করার সেই প্রবণতা, যেখানে নীতিনির্ধারকেরা বর্তমানের তুলনামূলক কম বিনিয়োগ এড়িয়ে যান, অথচ পরে অনেক বেশি খরচ করতে বাধ্য হন?

এটি কি এমন এক ধরনের ‘কৃচ্ছ্রসাধনের অভিনয়’, যেখানে সরকার জনব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্কতার ভাব দেখায়। কিন্তু একই সঙ্গে দেশকে আরও ব্যয়বহুল আমদানির ওপর নির্ভরশীল করে তোলে? নাকি দেশীয় গ্যাসের বদলে এলএনজিকে বারবার অগ্রাধিকার দেওয়া এমন একটি রেন্ট-সিকিং সিনড্রোম বা প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রভাবশালী বাণিজ্যিক গোষ্ঠী আমদানিনির্ভর নীতি থেকে লাভবান হয়?

সরকার একই ভুল বারবার করতে পারে না, তারপর প্রতিটি বিলম্বকে বিচ্ছিন্ন কারিগরি বা আর্থিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না। ৬০০ কোটি টাকার একটি পাইপলাইন যখন বছরের পর বছর পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন থেকে নয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে পরিণত হয়। আর একই সময়ে আমদানি করা এলএনজির পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। তখন এই প্রবণতা নিয়ে গভীর তদন্ত হওয়া দরকার।

যদি আমরা ধরে নিই যে সরকার কোনো অবাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তাহলে এই সিদ্ধান্তে বিশেষ গোষ্ঠী স্বার্থর সঙ্গে সরকারের আঁতাতের প্রভাব থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

নতুন বিএনপি সরকারও যদি দেশীয় অনুসন্ধান ও অবকাঠামো উন্নয়ন বিলম্বিত করে ব্যয়বহুল আমদানিকে অগ্রাধিকার দিতে থাকে, তাহলে এ ক্ষেত্রে আগের সরকারগুলোর থেকে মৌলিকভাবে আলাদা প্রমাণিত হবে না। সরকার পরিবর্তনের অর্থ একই ত্রুটিপূর্ণ নীতির সুবিধাভোগী পরিবর্তন হওয়া উচিত নয়। যেকোনো নতুন প্রশাসনকে প্রমাণ করতে হবে যে সিদ্ধান্তগুলো জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে, আমদানি-নির্ভর ব্যবসায়িক লবি বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের চাপে নয়।

এলএনজি নির্ভরতার ব্যয়

ভোলা থেকে পাইপলাইন নির্মাণ যখন বিলম্বিত হচ্ছিল, তখন বাংলাদেশ দ্রুত এলএনজি আমদানির দিকে এগিয়ে যায়। ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয় এবং দেশের গ্যাস সংকট সমাধানের একটি বড় উপায় হিসেবে তা উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও গ্যাস সংকট দূর হয়নি।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮–১৯ থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। একই সময়ে সরকার গ্যাস খাতে আরও ৪৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। কয়েক দফা গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং পেট্রোবাংলা ক্রমশ বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

শুধু গত অর্থবছরেই বাংলাদেশ ৫৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১৩টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে। এর সঙ্গে আরও ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ১১৫টি কার্গো আমদানির সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারদর বর্তমান পর্যায়ে থাকলে শুধু এলএনজি আমদানিতেই প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার অত্যন্ত অস্থিতিশীল। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জাহাজ চলাচলের রুট এবং সরবরাহে বিঘ্ন, সবকিছুর ওপর দাম নির্ভর করে। জাপান-কোরিয়া মার্কার বা জেকেএম অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ২ হাজার ৮২২ টাকার বেশি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯৮ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। ফেব্রুয়ারিতে দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ১ হাজার ৩১৯ টাকা। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১১৪ শতাংশ বেড়েছে।

এই অস্থিরতা এলএনজিকে জাতীয় জ্বালানি নীতির ভিত্তি হিসেবে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

আরও টার্মিনাল, আরও আর্থিক চাপ

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার আরও ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। একটি নতুন টার্মিনাল ইতোমধ্যে প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে মহেশখালীতে বাংলাদেশের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সরবরাহক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। আরও দুটি টার্মিনাল নির্মিত হলে এই সক্ষমতা বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়াতে পারে।

কিন্তু একটি টার্মিনালের ব্যয় শুধু নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্যাস খালাস, সংরক্ষণ, পুনর্গ্যাসীকরণ এবং উচ্চচাপের পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে পরিবহনের প্রয়োজন হয়। নতুন পাইপলাইন নির্মাণের জন্য পথ জরিপ, পরিবেশগত মূল্যায়ন, জমি অধিগ্রহণ এবং কয়েক বছর ধরে নির্মাণকাজ চালাতে হয়। ফলে তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে প্রস্তাবিত কোনো টার্মিনাল দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নাও করতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টার্মিনাল নির্মাণের পরও বাংলাদেশকে এলএনজি কিনতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, আরও দুটি টার্মিনাল চালু হলে বার্ষিক আমদানি ব্যয় বেড়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। পেট্রোবাংলার কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, চারটি টার্মিনাল হলে বছরে এলএনজি আমদানিতে অন্তত ১ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

আইইইএফএর একটি প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, দেশীয় গ্যাসের আবিষ্কার সীমিত পর্যায়ে থাকলে এবং এলএনজির দাম অস্থিতিশীল থাকলে ২০২৯–৩০ অর্থবছরে বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি বিল ১ লাখ ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। বাজারদর আরও বাড়লে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

তাই নতুন টার্মিনাল নির্মাণে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আগে বাংলাদেশকে ভাবতে হবে, আমরা কি এমন অবকাঠামো তৈরি করছি, যা আমদানিনির্ভরতা আরও গভীর করবে এবং স্থায়ী আর্থিক বোঝা সৃষ্টি করবে?

ভোলার বাইরেও দেশীয় সম্ভাবনা

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কয়েকটি উপায় চিহ্নিত করেছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্যাসের সম্ভাবনা শুধু নতুন ও অনাবিষ্কৃত এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যেও উল্লেখযোগ্য মজুদ থাকতে পারে।

বাংলাদেশে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০টি কার্যকর বা উৎপাদনশীল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একটি গ্যাসক্ষেত্রে এক বা কয়েকটি কূপ খনন করলেই সব গ্যাস উত্তোলন করা যায় না। ভূতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতার কারণে গ্যাস অনেক সময় এমন এলাকায় আটকে থাকে, যেগুলোকে ‘আনড্রেইনড কম্পার্টমেন্ট’  বলা হয়।

বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক তথ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যাখ্যা এবং পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে এসব অনুত্তোলিত কম্পার্টমেন্ট চিহ্নিত করা সম্ভব। এরপর ওই এলাকায় নতুন কূপ খনন করা যেতে পারে। একই ক্ষেত্রে আগে গ্যাস পাওয়া গেছে বলে সাফল্যের সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে বেশি হবে। বিদ্যমান পাইপলাইন ও প্রক্রিয়াকরণ অবকাঠামোও ব্যবহার করা যাবে, ফলে গ্যাস সরাসরি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয় সুযোগ হলো পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার বা সংস্কার। বাংলাদেশে অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। ফলে অনেক কূপ এখন পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত। এসব কূপ মেরামত করা গেলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

তৃতীয় সুযোগ রয়েছে গভীর খননে। প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক গ্যাসক্ষেত্র একটি নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্তই অনুসন্ধান করা হয়েছে। আরও গভীর ভূতাত্ত্বিক স্তরে অতিরিক্ত গ্যাস থাকতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি গভীর খনন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভালো ফল দিতে পারে।

অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন তিতাস, বাখরাবাদ ও বিবিয়ানা কাঠামোর আশপাশের কম অনুসন্ধান করা এলাকাগুলোর কথাও উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া কলকাতা থেকে পাবনা, ময়মনসিংহ হয়ে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত হিঞ্জ জোন, সিলেট ট্রফ বা সুরমা অববাহিকা এবং হাতিয়া ট্রফও গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমুদ্রসীমার এলাকাগুলোর প্রতিও আরও মনোযোগ দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে কিছু ভূতাত্ত্বিক সাদৃশ্য রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলের। সেখানে ১৫০টিরও বেশি অনুসন্ধানী কূপ থেকে আনুমানিক ২ দশমিক ৭ টিসিএফ প্রমাণিত গ্যাস পাওয়া গেছে। সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ ১৪ টিসিএফ পর্যন্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। বাংলাদেশে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৮টি শনাক্ত কাঠামো রয়েছে, কিন্তু সেখানে অনুসন্ধান এখনো সীমিত।

বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাতেও সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকার কিছু অংশের সঙ্গে মিয়ানমারের গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোর ভূতাত্ত্বিক সাদৃশ্য আশাব্যঞ্জক।

অনুসন্ধানের অর্থনীতি

দেশীয় গ্যাসের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য আয়ের তুলনায়।

আনোয়ার হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০টি কূপ খনন করলে অন্তত ৫ টিসিএফ গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। ওই গ্যাসের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা। ৩০টি কূপ খননের ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খরচ যুক্ত হলে তা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।

এটি নিশ্চিতভাবে গ্যাস আবিষ্কারের হিসাব নয়। অনুসন্ধানে ঝুঁকি থাকে এবং কিছু কূপে গ্যাস নাও পাওয়া যেতে পারে। তবে একটি শুষ্ক কূপ মানেই সম্পূর্ণ ক্ষতি নয়। সেখান থেকে পাওয়া ভূতাত্ত্বিক তথ্য ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানকে উন্নত করতে এবং অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

এলএনজির সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়। ৩০টি কূপ খননের জন্য মোট প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা শুধু গত অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে ব্যয় করা ৫৯ হাজার ৮০০ কোটি টাকার তুলনায় অনেক কম। ভর্তুকিসহ এই ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩০টি কূপ খননের ব্যয় গত বছরের এলএনজি আমদানি ও ভর্তুকি ব্যয়ের প্রায় এক-সপ্তমাংশ।

দেশীয় অনুসন্ধান স্থায়ী জাতীয় সম্পদও তৈরি করে: গ্যাসের মজুদ, অবকাঠামো, কারিগরি দক্ষতা এবং ভূতাত্ত্বিক তথ্য। বিপরীতে, এলএনজিতে ব্যয় করা অর্থের বড় অংশই দেশ থেকে বেরিয়ে যায় এবং গ্যাস ব্যবহৃত হয়ে গেলে কোনো স্থায়ী সম্পদ অবশিষ্ট থাকে না।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি কৌশল

বাংলাদেশ এখনই এলএনজি আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। বর্তমানে দেশীয় উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যকার ঘাটতি পূরণে আমদানি প্রয়োজনীয়। অবিলম্বে আমদানি বন্ধ করা অযৌক্তিক হবে। তবে ভবিষ্যতে এলএনজি দেশীয় গ্যাসের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত, বিকল্প হিসেবে নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থেই আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করতে হবে এবং নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা বন্ধ করতে হবে।

দেশীয় গ্যাস মাটির নিচে রেখে প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভর করা অযৌক্তিক। বাংলাদেশের এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি মিশ্রণ দরকার, যা নিজস্ব মজুদ সুরক্ষিত রাখবে, আর্থিক ঝুঁকি কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়াবে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে।

সরকারের উচিত ভোলা পাইপলাইন প্রকল্প, ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা, পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার, গভীর খনন এবং স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমার কম অনুসন্ধান করা এলাকায় অনুসন্ধান দ্রুত বাস্তবায়ন করা। বাপেক্সকে আধুনিক রিগ, সফটওয়্যার, সিসমিক প্রযুক্তি এবং দক্ষ প্রকৌশলী ও ভূতাত্ত্বিকদের কাজের উন্নত সুযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে বিদেশি কোম্পানিকে যুক্ত করা যেতে পারে। তবে চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থ, মালিকানা, সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখতে হবে।

প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ৩০টি কূপ থেকে সম্ভাব্যভাবে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এলএনজি আমদানির ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম। ভোলা পাইপলাইন ও দেশীয় অনুসন্ধান যদি আগে শুরু করা হতো, তাহলে বাংলাদেশ প্রায় চার বছরের এলএনজি আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করতে পারত।

প্রশ্নটি এখন আর এই নয় যে বাংলাদেশ দেশীয় গ্যাসে বিনিয়োগ করতে পারে কি না। বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বিনিয়োগ না করে চলার সামর্থ্য আছে কিনা।

সুযোগ এখনো আছে। দেশীয় গ্যাসে বিনিয়োগ না করা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, দেশীয় গ্যাসে বিনিয়োগ করাই এখন অপরিহার্য।

ড. মোশাহিদা সুলতানা: জ্বালানি গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Share post:

Popular

More like this
Related

মোবাইল নেটওয়ার্কের মান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যে ধোঁয়াশা

জুলাই মাসে বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক...

বিয়ে নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন ববি

অভিনেত্রী ইয়ামিন হক ববি তার কথিত স্বামী নিয়ে ছড়ানো...

ইরানে ট্রাম্প কী চান?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার হুমকি দিলেও, দীর্ঘমেয়াদি বা...

আড়াইশো বছরের ইতিহাসে অনন্য নজির ল্যাথাম-কনওয়ের

টেস্ট ক্রিকেট তো বটেই, ২৫৩ বছর ধরা চলা প্রথম...