বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একটি শব্দ বেশ দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠেছে—‘তৌহিদী জনতা’। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভাষায় শব্দটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে খুবই সরল। কিন্তু গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই নামের ব্যানারে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো একটু খেয়াল করলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে। এই ‘তৌহিদী জনতা’ আসলে কারা?
প্রথম সমস্যাটিই হলো তাদের পরিচয়। ‘তৌহিদী জনতা’ কোনো একক সংগঠনের নাম নয়। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে কখনো স্থানীয় মুসল্লি, কখনো মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, কখনো ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী এবং কখনো কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এমন মানুষকেও এই পরিচয়ে দেখা গেছে।
দিনাজপুরের হাকিমপুরে নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধের দাবির ঘটনাটিই ধরা যাক। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠনের লোকজনের পাশাপাশি স্থানীয় মুসল্লিরাও ছিলেন। একই ঘটনায় খেলাফত মজলিসের স্থানীয় এক দায়িত্বশীলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথাও সংবাদে এসেছে।
তাই ‘তৌহিদী জনতা’কে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামো হিসেবে দেখা কঠিন। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি এমন একটি পরিচয়, যার মাধ্যমে কোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে দ্রুত মানুষকে সংগঠিত করা হচ্ছে।
এই পরিচয়ের বিস্তার বোঝার জন্য গত দুই বছরের ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে জনতার হস্তক্ষেপ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি, মাজার ঘিরে সংঘাত, নারী ফুটবল ম্যাচ বন্ধের দাবি, বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবসের আয়োজন নিয়ে আপত্তি, লালন স্মরণোৎসব বন্ধের চেষ্টা, মাজারে হামলা, বইমেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে চাপ, নাট্য আয়োজন বন্ধের দাবি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার মতো একাধিক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
এসব ঘটনার মধ্যে একটি মিল দেখা যায়।
প্রথমে কোনো আয়োজন বা কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থী, অনৈতিক বা ইসলামবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর স্থানীয়ভাবে মানুষ সংগঠিত হয়। এরপর শুরু হয় বিক্ষোভ, অবস্থান এবং সহিংসতা।
দিনাজপুরে নারী ফুটবল ম্যাচ ঘিরে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ভালোবাসা দিবসে ফুল বিক্রির দোকানে হামলা এবং পরে আয়োজন বাতিলের ঘটনাও সংবাদে এসেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নাটক মঞ্চায়ন নিয়েও ‘তৌহিদী জনতা’র আপত্তির খবর প্রকাশিত হয়।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো মাজার ও সুফি সংস্কৃতিকে ঘিরে সংঘটিত হামলা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের নুরাল হক ওরফে নুরাল পাগলাকে ঘিরে ঘটনাটি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ। মৃত্যুর পর কবর থেকে তার মরদেহ তুলে নেওয়া হয়। পরে সেই মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। কবর থেকে মরদেহ তোলার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
মাজারে হামলার সংখ্যাও কম নয়।
পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর ৪০টি মাজারে ৪৪ বার হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ২৩ জনকে ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিশ্ব সুফি সংস্থা আরও বড় সংখ্যা দিয়ে ৮০টি মাজারে হামলার কথা জানিয়েছিল।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে ১৭ মাসে ৯৭টি মাজারে হামলার তথ্য উঠে আসে। সেখানে ৫৯টি হামলার কারণ হিসেবে ধর্মীয় মতবিরোধ, ২১টি স্থানীয় বিরোধ এবং ১৬টির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কথা বলা হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এসব ঘটনা একই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উৎস থেকে সৃষ্টি হয়নি। কিছু ঘটনা ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে ঘটেছে, কিছু স্থানীয় বিরোধের কারণে এবং কিছু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে যুক্ত। ফলে ‘তৌহিদী জনতা’ নামটি কখনো ধর্মীয় পরিচয়ের প্রকাশ, কখনো স্থানীয় ক্ষোভ সংগঠিত করার একটি পরিচয় এবং কখনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানুষ জড়ো করার একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে।
সম্প্রতি সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা লাউতা ইউনিয়ন’ নামে একটি পক্ষ ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা মসজিদে সভা করে ২৮ আগস্টের আয়োজন বাতিলের দাবি তোলে। শেষ পর্যন্ত ‘আগামী বছর থেকে সুনাই নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজন না করার’ শর্তে এবারের আয়োজন সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সমকালে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, একটি স্থানীয় সামাজিক আয়োজন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? মানুষ কোনো আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানাতে পারে, প্রতিবাদ করতে পারে, প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করতে পারে। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কোনো স্বঘোষিত জনতার নয়।
আরও বড় সমস্যা তৈরি হয়, যখন অভিযোগ আর প্রমাণকে এক করে দেখা হয়।
ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড তার ভয়াবহ উদাহরণ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে হত্যা করা হয়, মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী তদন্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্যের কোনো প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
এখানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা দরকার। বাংলাদেশের সংবিধান ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের শাসনের ভিত্তিও নিশ্চিত করে। কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে তার বিচার রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে হতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে, প্রমাণ দেখতে হবে, তারপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু জনতা বিচার করবে না।
এই সীমারেখা ভেঙে গেলে ক্ষতি শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা মাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় স্বাধীনতাও নিরাপদ থাকবে না। কারণ, আজ যে জনতা অন্যের আয়োজন বন্ধ করছে, কাল তার নিজের কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক আয়োজনও অন্য কোনো সংগঠিত জনতার আপত্তির মুখে পড়তে পারে। একবার যদি মবের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াকে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়, তাহলে শক্তিশালী পক্ষ দুর্বল পক্ষের ওপর নিজের নৈতিকতা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ পায়।
এই কারণেই ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ‘তৌহিদী জনতা’র নামে হামলা ও নিপীড়নকারীদের সতর্ক করেছিলেন। পরে ওই শব্দ ব্যবহারের জন্য তিনি দুঃখপ্রকাশও করেন। একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও মবের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়।
২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তর অনলাইনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিলেটে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগর নেতারা ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের ‘তৌহিদী জনতা’ না বলে দুর্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছেন।
অর্থাৎ ‘তৌহিদী জনতা’ মানেই উগ্রবাদী নয়। আবার ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে হওয়া প্রতিটি কাজও দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে না। এই পার্থক্য না করলে দুটি বিপদ তৈরি হবে। একদিকে শান্তিপূর্ণ ধর্মপ্রাণ মানুষ অন্যায়ভাবে সন্দেহের চোখে পড়বেন। অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে যারা ভয় দেখানো, হামলা, ভাঙচুর বা সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারা নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের সমাজ বহু বৈচিত্র্যের। এখানে বাউল গান থাকবে, লালনচর্চা থাকবে, মাজার ও সুফি সংস্কৃতিও থাকবে। এখানে হিন্দু থাকবে, মুসলমান থাকবে, অন্য ধর্মের মানুষও থাকবে। পাহাড় থেকে সমতল, সব জায়গার মানুষই নিজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বাঁচবে। এই সহাবস্থানই বাংলাদেশের শক্তি।
আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হিসেবে এই সহাবস্থান রক্ষার সবচেয়ে বড় দায়িত্বও মুসলমানদেরই নিতে হবে। ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে অন্যের অধিকারকেও সম্মান করতে হবে।
ধর্ম থাকবে তার মর্যাদায়, সংস্কৃতি থাকবে তার স্বাধীনতায়, মতপ্রকাশ থাকবে আইনের সীমার মধ্যে। কেউ অপরাধ করলে তার বিচার হবে। কিন্তু বিচার করবে রাষ্ট্র। জনতা নয়।
সাজ্জাদ সাব্বির: কেন্দ্রীয় সদস্য, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
