মাছ, পাখি, ধান, শামুক, মৌমাছি কিংবা মানুষ—আমাদের শরীর লাখো কোটি কোষের এক একটি জীবন্ত বই। কোষে মাইটোকন্ড্রিয়া, নিউক্লিয়াস, ডিএনএ থাকে। মাইটোকন্ড্রিয়ারাই শক্তি জুগিয়ে প্রতিটি প্রাণকে জীবন্ত রাখে। তাই একে কোষের শক্তিঘর বলে। প্রকৃতি ও মানুষের সমাজ নিয়ে একটি গ্রামকে যদি জীবন্ত বই ধরা হয়, তাহলে সেই গ্রামের নারীরা হলো তার মাইটোকন্ড্রিয়া—গ্রামের শক্তিঘর।
কৃষিকাজ, ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবেশন, ভেষজ চিকিৎসা, বীজ সংরক্ষণ, মাছ ও বুনো খাদ্য সংগ্রহ, প্রাণিসম্পদ পালন, সেলাই ও রন্ধন, কুটিরশিল্প, লোকসংস্কৃতি চর্চা, দুর্যোগ সামাল কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে এই নারীরা বাঁচিয়ে রাখছেন গ্রামের পর গ্রাম। বাংলাদেশের প্রায় ৯০ হাজার গ্রামের প্রাণশক্তি গ্রামীণ নারীরাই। এই মাইটোকন্ড্রিয়াদের নিরবচ্ছিন্ন অবদানের কারণেই পরিবার, সমাজ ও গ্রামগুলো জীবন্ত থাকে। কিন্তু গ্রামীণ নারীর এই অবদান, জ্ঞান প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা অধিপতি কাঠামোতে বরাবরই অস্বীকৃত ও প্রান্তিক।
একটি কোষের ভেতর নিউক্লিয়ার ডিএনএ মূলত বংশগতির ভাণ্ডার। তবে মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএও আমাদের বংশগতি বহন করে। কেবল মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএই লাখো বছর ধরে মাতৃসূত্রীয় ধারায় কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বংশ থেকে বংশে জীবন্ত রাখে। আর এই স্মৃতিস্বাক্ষ্য কেবলমাত্র নারীর মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএই বহন করে। প্রকৃতিজগতের মাইটোকন্ড্রিয়ার মতো আমাদের সাংস্কৃতিক পরিসরেও গ্রামীণ নারীরা সমাজের লোকায়ত জ্ঞানধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলেছেন। বিশেষ করে ফসলের জাত বাছাই ও বীজ নির্বাচন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, ধাত্রীবিদ্যা, বয়ন ও রন্ধনশিল্প কিংবা ভেষজ চিকিৎসার মতো জটিল জ্ঞানচর্চা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এখনো সাবঅল্টার্ন গ্রামীণ নারীর ডিসকোর্স।
কোষের মাইটোকন্ড্রিয়া রুগ্ন হলে বা ক্ষয়ে গেলে কোষ বিপদগ্রস্থ হয়, শরীর অসুস্থ হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে গ্রামীণ নারীর বিপদ, সংকট, বঞ্চনা, বৈষম্য, নিপীড়ন, প্রান্তিকতা ও অপরায়নের ওপর নির্ভর করে কোনো গ্রামের নিরাপদ ও সুস্থ বিকাশ। শরীরকে বুঝতে হলে কোষ-বই পাঠ করতে হয়, সমাজ বুঝতে হলে গ্রামীণ নারীর অবদান ও আওয়াজকে পাঠ করা জরুরি।
২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০৮ সালে প্রথম দিবসটি পালনের বৈশ্বিক চল শুরু হওয়ার পর থেকে ১৫ অক্টোবর কেবলমাত্র গ্রামীণ নারীর অবদানের স্মরণের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং কৃষি, খাদ্য ব্যবস্থা, জলবায়ু ও সামগ্রিক উন্নয়নে গ্রামীণ নারীর অবদান ও নেতৃত্বের প্রশ্নটি সামনে আনার এক বৈশ্বিক মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরে গ্রামীণ নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘গ্রামীণ নারীর উত্থান: বেইজিং +৩০ এর মাধ্যমে সহনশীল ভবিষ্যত নির্মাণ’। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রামে গ্রামে এই দিবসটি আয়োজন করে না। অথচ এশিয়ার সবচেয়ে বড় গ্রাম বানিয়াচং বাংলাদেশেই। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে ১৩টি স্ট্যান্ডিং কমিটি আছে। নারী ও শিশু কল্যাণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কৃষি ও পল্লী অবকাঠামো স্ট্যান্ডিং কমিটি তো দিবসটি আয়োজন করতে পারে! গ্রামের সব শ্রেণি-পেশা-বর্গের নারীদের জমায়েত করতে পারে। গ্রামীণ উন্নয়নে তাদের অবদান ও বঞ্চনার গল্পগুলো শুনতে পারে। এখান থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ বাৎসরিক পরিকল্পনা ও বাজেট করতে পারে। আর গ্রাম থেকে উঠে আসা নারীদের শক্তিময় বয়ানেই তৈরি হতে পারে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও ইনক্লুসিভ জাতীয় উন্নয়ন রূপরেখা।
২০২৬ সালকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে চলতি বছরে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক চারণভূমি ও পশুচারণজীবী বর্ষ’। আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ নিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তৎপরতা এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং প্রতিদিন কর্মক্ষেত্র সংকোচন, মজুরিবৈষম্য, ঋণের চাপ ও জলবায়ু সংকটের কারণে গ্রামীণ নারীরা শহরে এসে ‘পরিচয়’ হারিয়ে ফেলছেন। গ্রামীণ ব্যবস্থার প্রতি চরমভাবে অমনোযোগী উন্নয়ননীতি এবং পুরুষতান্ত্রিক বলপ্রয়োগ সামগ্রিক উন্নয়নকে বাইনারি, উপনিবেশিক, বর্ণবাদী ও বৈষম্যের চশমা দিয়ে দেখে। সমাজ, রাষ্ট্র ও করপোরেট বৈষম্যের এই চশমা ভাঙতে হবে। অবদানের স্বীকৃতিসহ সামগ্রিক পরিসরে গ্রামীণ নারীর ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পদে প্রবেশাধিকার ও মালিকানার অমীমাংসিত তর্ক
গ্রামীণ নারীর শ্রমকে অস্বীকার ও আড়াল করলে আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা কী টিকে থাকবে? বিশ্বে কর্মরত নারীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ গ্রামীণ কৃষি-ব্যবস্থায় জড়িত। দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার অনেক বেশি, প্রায় ৭১ শতাংশ (এফএও ২০২৩)। গ্রামীণ নারীরা শুধু বসতভিটা, কৃষিজমি, ঘের, চা-বাগান কিংবা খামারে কাজ করেন না; তাদের কর্মক্ষেত্র বহুমুখী ও বহুস্তরীয়। কিন্তু নিদারুণভাবে গ্রামীণ নারীর এই বহুমুখী শ্রম ও মেধার অবদান সর্বপরিসরে স্বীকৃত নয়।
গ্রামীণ নারী দিবস উপলক্ষ্যে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, কৃষিতে বিশ্বব্যাপী নারীর শ্রমশক্তি ৪০ শতাংশ হলেও মাত্র ১৫ ভাগ নারীর হাতে কৃষিজমির মালিকানা আছে। উৎপাদন থেকে পরিবেশন সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থায় মালিকানা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের প্রশ্নে গ্রামীণ নারীর অধিকার রুদ্ধ ও সীমিত।
নানা গবেষণায় প্রমাণিত যে, পুরুষের তুলনায় গ্রামীণ নারীকে মজুরি কম দেওয়া হয়। দেখা গেছে, এই মজুরিবৈষম্যের কারণে আকারে এক হলেও পুরুষের তুলনায় নারী পরিচালিত খামারে উৎপাদন কমে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২৬ সালের এক গবেষণা জানায়, এই উৎপাদনশীলতার ব্যবধান প্রায় ২৪ শতাংশ। অথচ নারীরা যদি পুরুষের সমান সম্পদের অধিকার পেতেন তবে উৎপাদন আরও ২০-৩০ শতাংশ বেড়ে যেত এবং এই বাড়তি উৎপাদন দিয়ে বিশ্বের আরও ১৫ কোটি মানুষের আহার জোগান দেওয়া যেত। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নারী-পুরুষের সমমজুরি, সমান অংশগ্রহণ, মালিকানার অধিকার নিশ্চিত হলে বৈশ্বিক জিডিপি প্রায় ১ শতাংশ বাড়বে এবং প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
নানামুখী চাপ ও বোঝা বাড়ছে
২০২২ সালের জনশুমারি মতে, বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় বাস করেন প্রায় ৫ কোটি ৭৯ লাখ নারী, যা গ্রামীণ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। কৃষি ও গ্রামীণ খাদ্য ব্যবস্থায় ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও অবদান থাকলেও কৃষক হিসেবে গ্রামীণ নারীর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের ২০২৬ সালের তথ্য মতে, দেশের কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ নারী।
বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর এই বিপুল কৃষি-অর্থনৈতিক অবদান জিডিপির বিশাল ধারাপাতে হিসাব করা হয় না। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের এক হিসাব দেখায়, গৃহস্থালি শ্রমে নারীর আর্থিক অবদান প্রায় ৬ দশমিক ৭ লাখ কোটি টাকা। কৃষিজমি, কৃষিঋণ, কৃষি উপকরণ, সেচ, প্রযুক্তি, বাজার, কৃষিসেবাসহ ডিজিটাল প্রযুক্তিতেও নারীর প্রবেশাধিকার ও কার্যকর অংশগ্রহণ এখনো পুরুষের তুলনায় কম। একইসঙ্গে কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে পুরুষের চেয়ে নারীর ওপর পারিবারিক ও গৃহস্থালি কাজের বোঝা বেশি।
গ্রামীণ নারীর সংকট ও চ্যালেঞ্জ কেবলমাত্র সম্পদ ও মালিকানার নয়; বরং স্বীকৃতি ও মর্যাদার অভাবই গ্রামীণ নারীকে আরও বেশি প্রান্তিকতর করে তুলে। নানান সামাজিক, বর্গীয়, পেশাগত ও ভৌগোলিক বঞ্চনার কারণে বহু নারীর কৃষি উৎপাদন কর্মক্ষেত্রও বাধার সম্মুখীন হয়। কৃষক হিসেবে অস্পষ্ট ও দুর্বল পরিচয় রাষ্ট্রীয় কৃষিসেবা, কৃষক কার্ড, ভর্তুকি, প্রশিক্ষণ কিংবা সৃজনশীল উদ্যোক্তা তৈরিতে গ্রামীণ নারীকে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। গ্রামীণ নারীর ওপর নানামুখী চাপ ও কাজের বোঝা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। জলবায়ু সংকটের কারণে উপকূল, পাহাড়, বরেন্দ্র বা নগরবস্তির নারীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক কলস পানির জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয়, হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল। এমনকি দুর্যোগের সময় হাঁস-মুরগি, গৃহস্থালি সম্পদ সামলে পরিবার-পরিজনকে নিরাপদে সরিয়ে সব নারী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেন না। গ্রামীণ নারীর কৃষি, কুটিরশিল্প, চিকিৎসা, রেসিপি ও সৃজনশীল চর্চার নকশা ও লোকায়ত জ্ঞান নারীদের অনুমতি ছাড়াই হরহামেশা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়, যা নারীর লোকায়ত জ্ঞানের মেধাসম্পদ অধিকারের লঙ্ঘন।
গ্রামীণ নারী দিবসের ডাক
প্রতিদিন কৃষিজমি হারানো ‘কৃষিপ্রধান’ দেশের হরদম চাপ সামলানো একজন গ্রামীণ নারীর কাছে এই দিবসের বার্তা খুব জরুরি না হলেও, গ্রামীণ নারীর আয়নায় কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা দেখার দাবি এই দিবসের অঙ্গীকার হতে পারে। ‘অদৃশ্য শ্রমিক’ নয়; গ্রামীণ নারীকে কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত দানকারী কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একইসঙ্গে নারীর কৃষি জ্ঞান, বীজ সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজন চর্চা বিকাশে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা জোরদার করতে হবে।
জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদে (সিডও) গ্রামীণ নারীর কৃষি, ভূমি, ঋণ, পানি, স্যানিটেশন, প্রযুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা ও সিদ্ধান্তগ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) নারীর কৃষিজমির মালিকানা ও নিরাপদ অধিকারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে যুক্ত। বাংলাদেশের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে (২০১১) কৃষিতে নারীর শ্রম ও অবদানের স্বীকৃতি, সমমজুরি, কৃষি উপকরণ ও ঋণে নারীর সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় কৃষি নীতির (২০১৮) একটি বিশেষ অধ্যায় হলো ‘কৃষিতে নারী’।
জাতীয় ও বৈশ্বিক নীতি ও সনদে বহু অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। গ্রামীণ নারীকে উন্নয়নের ‘সুবিধাভোগী’ হিসেবে নয়; নির্মাতা হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে। গ্রামীণ নারী কেবলমাত্র ভালো আহারই জোগায় না; বরং বীজ ও প্রাণসম্পদের বৈচিত্র্য, লোকায়ত জ্ঞান ও স্থানীয় পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। কাঠামোগত বঞ্চনা ও জলবায়ু সংকট সামাল দিয়ে মাইটোকন্ড্রিয়ার মতো শক্তিঘর হয়ে জাগিয়ে রাখে পৃথিবী।
